বাংলাদেশে শিল্প খাতের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে গতি, বিকেন্দ্রীভূত জ্বালানি ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা দেখছে আইইইএফএ

ঢাকা, ৪ আগস্ট ২০২৬: শিল্প কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুতের দ্রুত সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিকেন্দ্রীভূত জ্বালানি সম্পদ (ডিস্ট্রিবিউটেড এনার্জি রিসোর্সেস-ডিইআর) খাত নতুন গতি পাচ্ছে। বর্তমানে ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রোকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন (ইপিসি) কোম্পানিগুলোর হাতে ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের পাইপলাইন রয়েছে। অন্যদিকে, সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট নতুন উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)-এর প্রকাশিত ‘Role of Distributed Resources in Energy Transition: A Multi-country Perspective’ শীর্ষক ব্রিফিং নোটে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রনির্ভর কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থাই এখনও বাংলাদেশের প্রধান শক্তি সরবরাহ ব্যবস্থা। তবে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, সৌরচালিত সেচ, ব্যাটারি সংরক্ষণ এবং ভেহিকেল-টু-গ্রিড (V2G) প্রযুক্তির মতো বিকেন্দ্রীভূত জ্বালানি ব্যবস্থা পরিচ্ছন্ন, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহে দ্রুত গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশ, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে আইইইএফএ বলেছে, ডিইআর খাতের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি এখন ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের স্থাপিত সক্ষমতা ৪১৮.১ মেগাওয়াট। তবে আইইইএফএ-এর হিসাব অনুযায়ী, বিভিন্ন শিল্প গ্রুপসহ ২৩৯টি প্রতিষ্ঠানে স্থাপিত সক্ষমতা ইতোমধ্যে ৬৬৭ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। ০.১৫ মেগাওয়াটের নিচের ছোট প্রকল্পগুলো যুক্ত করলে দেশের মোট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের এই দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদাও কিছুটা কমেছে। ২০২৪ সালের ১৬ এপ্রিল থেকে ১১ জুন সময়ের সঙ্গে ২০২৬ সালের একই সময়ের বিদ্যুৎ চাহিদার তুলনায় এ প্রবণতা দেখা গেছে।

আইইইএফএ-এর দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক এবং গবেষণার সহলেখক শফিকুল আলম বলেন, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশের গ্রিড-সংযুক্ত পরিবর্তনশীল নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা ছিল ৮৫৯ মেগাওয়াট। এর তুলনায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের দ্রুত অগ্রগতি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।

তিনি বলেন, বর্তমানে ইপিসি কোম্পানিগুলোর হাতে ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে। তবে শুধু শিল্প খাতেই কয়েক হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা রয়েছে, যা কাজে লাগাতে আরও কার্যকর নীতি সহায়তা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ডিজেলনির্ভর সেচ খাত সৌরবিদ্যুতের জন্য বিশাল সম্ভাবনার ক্ষেত্র। ডিজেলচালিত সেচ ব্যবস্থার এক-তৃতীয়াংশ সৌরচালিত করা গেলে বছরে প্রায় ২৪ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের ডিজেল আমদানি ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, নেট মিটারিং নীতিমালা ও স্বল্পসুদে অর্থায়নের সুযোগ থাকলেও সাম্প্রতিক বিদ্যুৎমূল্য বৃদ্ধি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগে আরও উৎসাহিত করছে। একইভাবে ডিজেলের উচ্চমূল্য কৃষি উদ্যোক্তাদের সৌরচালিত সেচে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তুলছে।

তবে উচ্চ আমদানি শুল্ক এখনও অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা। যদিও সরকার সম্প্রতি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের শুল্ক কাঠামো সংশোধন করেছে, আইইইএফএ বলছে, কঠোর শর্তের কারণে ছোট গ্রামীণ প্রকল্পগুলো এ সুবিধা পাবে না। পাশাপাশি শিল্প খাতের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে কার্যকর আমদানি শুল্ক আগের ১ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ১৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

আইইইএফএর মতে, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে মূলধনী ভর্তুকি ও কর-প্রণোদনা ডিইআর খাতের দ্রুত বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশেও সব ধরনের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য পূর্ণ শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হলে ২০২৬-২০৩০ মেয়াদে ১০ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা অর্জনের সরকারি লক্ষ্য বাস্তবায়ন সহজ হবে। এই লক্ষ্যের অর্ধেকেরও বেশি আসার কথা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নেট মিটারিং সংযোগের আবেদন ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে অনুমোদনের বিধান থাকলেও বাস্তবে অনেক প্রকল্প দীর্ঘসূত্রতার শিকার হচ্ছে। এ কারণে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে অনলাইন আবেদন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত অনুমোদন নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের অভিজ্ঞতার আলোকে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সঙ্গে ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ ও পূর্বাভাসভিত্তিক করতে ধাপে ধাপে স্মার্ট মিটার চালুর পরামর্শ দিয়েছে আইইইএফএ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

six − 4 =