নিউইয়র্কে ৪১তম ফোবানা সম্মেলন ২০২৭: চেয়ারম্যান আতিক, সেক্রেটারি রহিম

ফ্লোরিডা প্রতিনিধি: আগামী বছর নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হবে উত্তর আমেরিকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম বৃহৎ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশনস ইন নর্থ আমেরিকা—ফোবানার ৪১তম সম্মেলন। যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী পুরনো বাংলাদেশি সংগঠন বাংলাদেশ লীগ অব আমেরিকা, নিউইয়র্ক এবারের সম্মেলনে আয়োজক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছে। ফ্লোরিডায় অনুষ্ঠিত ফোবানার বার্ষিক সাধারণ সভায় আগামী দুই বছরের জন্য নতুন এক্সিকিউটিভ কমিটি নির্বাচিত হয়েছে। নতুন কমিটিতে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন আতিকুর রহমান আতিক। ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন জিয়াউল হক জিয়া ও আমিনুল জিলানী কলিন্স। জেনারেল সেক্রেটারি হয়েছেন নেহাল রহিম। এ ছাড়া জয়েন্ট সেক্রেটারি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন ও ইমরান জনি আলম এবং ট্রেজারার নির্বাচিত হয়েছেন শাহেদুল ইসলাম অঞ্জন।

নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ফোবানার আগামী দুই বছরের সাংগঠনিক কার্যক্রমে নতুন গতি আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। বিশেষ করে ২০২৭ সালের ৪১তম সম্মেলন নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হওয়ায় নতুন কমিটির সামনে বড় ধরনের সাংগঠনিক দায়িত্ব তৈরি হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের মিলনমেলা ৪০তম ফোবানা সম্মেলন তিন দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে ৪ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিসিমির হলিডে ইন রিসোর্টে আয়োজিত এ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও কানাডা থেকে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি অংশ নেন।

চার দশকের পথচলা পূর্ণ করা এবারের ফোবানা সম্মেলনকে ঘিরে অরল্যান্ডোতে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। সংগীত, নৃত্য, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, আলোচনা, ব্যবসায়িক মতবিনিময়, যুবসমাজ ও নারী নেতৃত্বের বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি কমিউনিটির বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা ব্যক্তিদের সম্মাননা দেওয়া হয়। ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার শুরু হয় তিন দিনের এই বৃহৎ আয়োজন। বিকেল ৪টায় সম্মেলনের নিবন্ধন ও প্রদর্শনী কার্যক্রম শুরু হয়। সন্ধ্যা ৬টায় অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক শোভাযাত্রা ও পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠান। পরে রাত ৮টায় ব্যবসায়ী ও কমিউনিটি নেতাদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় ব্যবসা ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনা।

উদ্বোধনী আয়োজনে ফোবানার দীর্ঘ পথচলা, উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি কমিউনিটির ঐক্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মকে কমিউনিটির সঙ্গে সম্পৃক্ত করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। সম্মেলনের সভাপতি মোহাম্মদ শামীম মৃধা প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন। সম্মেলনের আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন সেন্টু আয়োজনে সহযোগিতার জন্য কমিউনিটির সর্বস্তরের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। ফোবানার নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান জাহিদ হাসান এবং নির্বাহী সচিব নেহাল রহিমও সম্মেলনের সার্বিক আয়োজন ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে বক্তব্য দেন।

দ্বিতীয় দিন ৫ সেপ্টেম্বর শনিবার ছিল সম্মেলনের অন্যতম ব্যস্ত দিন। সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত হয় যুব উদ্ভাবন সম্মেলন। এতে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব, নতুন চিন্তা, প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা কার্যক্রম এবং উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি কমিউনিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়। দুপুর ১টায় অনুষ্ঠিত হয় নারী নেতৃত্ববিষয়ক বিশেষ আয়োজন। এতে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত বাংলাদেশি নারীদের নেতৃত্ব, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং কমিউনিটির উন্নয়নে তাদের ভূমিকা নিয়ে মতবিনিময় হয়।

দিনের কর্মসূচির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল রাতের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে সংগীত ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। আয়োজকদের প্রকাশিত তালিকায় অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন ইমরান মাহমুদুল, দীনাত জাহান মুন্নী, প্রতীক হাসান, দিলশাদ নাহার কণা, আরজীন কামাল, আন্নানা ইয়াসমিন অংকন এবং রফিক আহমেদ মিল্টন।

এ ছাড়া অভিনেতা সাজু খাদেম, অভিনেত্রী পোরী মনি, সংগীতশিল্পী সানিয়া সুলতানা লিজা এবং অভিনেত্রী শ্রাবস্তী টিন্নীসহ আরও কয়েকজন শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণের কথা আয়োজকদের পক্ষ থেকে প্রচার করা হয়। জনপ্রিয় শিল্পীদের গান, নৃত্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় দ্বিতীয় দিনের রাতটি পরিণত হয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের আনন্দ-উৎসবে।

তৃতীয় দিন ৬ সেপ্টেম্বর রোববার ছিল সম্মেলনের শেষ দিন। সকাল ১১টায় অনুষ্ঠিত হয় কমিউনিটি সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান। এতে প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা ব্যক্তিদের স্বীকৃতি দেওয়ার আয়োজন করা হয়। দুপুর ২টায় অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন পণ্য ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের পরিচিতিমূলক আয়োজন। এতে অংশগ্রহণকারী ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা তাদের কার্যক্রম তুলে ধরেন। বিকেল ৪টায় অনুষ্ঠিত হয় বিদায়ী মধ্যাহ্নভোজ। এর মধ্য দিয়ে তিন দিনের ফোবানা সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের সমাপ্তি ঘটে।

তৃতীয় দিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল সংগীতশিল্পী নাফিজ আল আমিনকে বাংলা রক সংগীতে অবদানের জন্য বিশেষ সম্মাননা প্রদান। বাংলা রক সংগীতে তার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে শ্রেষ্ঠত্বের সম্মাননা দেওয়া হয়। এবারের ফোবানা সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের অংশগ্রহণ। ইমরান মাহমুদুল, দীনাত জাহান মুন্নী, প্রতীক হাসান, দিলশাদ নাহার কণা, আরজীন কামাল, আন্নানা ইয়াসমিন অংকন ও রফিক আহমেদ মিল্টনের পরিবেশনা দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে।

শিল্পীদের পরিবেশনায় বাংলাদেশের আধুনিক গান, জনপ্রিয় গান ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার পাশাপাশি প্রবাসের মাটিতে বাংলাদেশের সংগীত ও সংস্কৃতির আবহ তৈরি হয়। অভিনেতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিও অনুষ্ঠানে বাড়তি আকর্ষণ যোগ করে। প্রবাসী দর্শকদের সঙ্গে শিল্পীদের সরাসরি যোগাযোগ এবং তাদের পরিবেশনা পুরো আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। ৪০তম ফোবানা সম্মেলন হওয়ায় এবারের আয়োজনের গুরুত্ব ছিল আলাদা। চার দশক ধরে উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি কমিউনিটির সাংস্কৃতিক বন্ধন, সামাজিক যোগাযোগ এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ধরে রাখার ক্ষেত্রে ফোবানা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

অরল্যান্ডোতে দীর্ঘ বিরতির পর আবারও ফোবানা অনুষ্ঠিত হওয়ায় স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যেও ছিল ব্যাপক উৎসাহ। সম্মেলন সফল করতে হোস্ট কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ শামীম মৃধা, আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন সেন্টু, সদস্যসচিব রাসেল মিয়া, নির্বাহী সদস্যসচিব মুরাদ হোসেন, প্রধান সমন্বয়ক নাজিম উল্লাহ লিটন এবং অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনা আহ্বায়ক এ কে এম হোসেইন হিটুসহ কমিটির সদস্যরা কাজ করেন।

তিন দিনব্যাপী এ আয়োজনে শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, ব্যবসা, নেতৃত্ব, যুবসমাজ, নারী নেতৃত্ব, কমিউনিটি কার্যক্রম ও সম্মাননা—সবকিছুর সমন্বয় ঘটানো হয়। সব মিলিয়ে ৪ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর অরল্যান্ডোতে অনুষ্ঠিত ৪০তম ফোবানা সম্মেলন পরিণত হয় উত্তর আমেরিকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের এক বর্ণিল মিলনমেলায়। দেশ থেকে দূরে থেকেও বাংলা ভাষা, সংগীত, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রবাসীদের গভীর সম্পর্কের এক উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটেছে এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

seventeen + fourteen =