পারমাণবিক আইসব্রেকারে প্রত্যয়ের রোমাঞ্চকর উত্তর মেরু অভিযান শেষ

রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মালেহুল সালেহীন প্রত্যয় রোসাটমের সপ্তম আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষামূলক অভিযান ‘আইসব্রেকার অব নলেজ’ সফলভাবে শেষ করে রাশিয়ার মুরমানস্ক শহরে ফিরেছেন।

১০ দিনের এই রোমাঞ্চকর অভিযানে প্রত্যয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পারমাণবিক আইসব্রেকার ‘৫০ লেট পোবেদি’তে (50 Let Pobedy) উত্তর মেরু ভ্রমণ করেন। অভিযানের রুট ছিল মুরমানস্ক–উত্তর মেরু–ফ্রাঞ্জ জোসেফ ল্যান্ড–মুরমানস্ক। জলপথে এটি ছিল উত্তর মেরুতে পৌঁছানো কোনো পৃষ্ঠজাহাজের ২০০তম অভিযান।

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রত্যয় বলেন, “স্বপ্ন থেকে বিশ্বের চূড়ায় পৌঁছানোর এই যাত্রা আমার জন্য অবিস্মরণীয়। ২২টি দেশের মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি তাদের সংস্কৃতি ও ২২টি ভাষার বৈচিত্র্য সম্পর্কে জানার অনন্য সুযোগ পেয়েছি। মেরিন বায়োলজি, নিউক্লিয়ার ফিজিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ হয়েছে। উত্তর মেরু আমাকে জ্ঞান, বন্ধুত্ব ও এমন কিছু স্মৃতি উপহার দিয়েছে, যা আমি চিরকাল সযত্নে লালন করব।”

১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সী মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়ে এ অভিযানের আয়োজন করা হয়। প্রত্যয় এর আগে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স কম্পিটিশন, দ্য কুইনস কমনওয়েলথ রচনা প্রতিযোগিতা, ইন্টারন্যাশনাল ইয়ুথ ম্যাথ চ্যালেঞ্জ এবং বাংলাদেশ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অলিম্পিয়াডসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন করেছে।

পারমাণবিক আইসব্রেকার ‘৫০ লেট পোবেদি’র ক্যাপ্টেন রুসলান সাসোভ বলেন, “এ ধরনের সমুদ্রযাত্রা পরবর্তী প্রজন্মের বিকাশে সত্যিই অবদান রাখে। সবচেয়ে মেধাবী ও প্রতিভাবান তরুণেরা এসব অভিযানে অংশ নেয়। তাদের অনেকেরই উত্তর মেরু পরিদর্শন এবং মেরুভল্লুক দেখার স্বপ্ন ছিল। রোসাটম ও আমাদের নাবিক দল সেই স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করতে পেরেছে—এতে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।”

অভিযানে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের জন্য জাহাজে বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে ছিল একটি অ্যারোস্পেস ল্যাবরেটরি, যেখানে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়।

অভিযান চলাকালে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানীদের সঙ্গে দুটি বিশেষ পরীক্ষায় অংশ নেয়। তারা আর্কটিকের দুর্গম এলাকা ও নর্দার্ন সি রুটে যোগাযোগ ব্যবস্থায় সহায়তার জন্য তৈরি একটি রেডিওসোন্ড উৎক্ষেপণ করে। পাশাপাশি বিশ্বের প্রথম পুনরুদ্ধারযোগ্য স্ট্র্যাটোস্ফেরিক প্ল্যাটফর্মের পরীক্ষাতেও অংশ নেয় তারা।

রোসাটমের সায়েন্টিফিক ডিভিশনের আওতাধীন এনআইআইটিএফএ’র প্রজেক্ট ম্যানেজার ইয়েগোর প্লাখোটনিউক বলেন, “রোসাটমে আমরা প্রতিদিন এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করি, যা গতকালও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির অংশ বলে মনে হতো। অভিযানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা রুশ বিজ্ঞানের ভবিষ্যতমুখী কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে পেরেছে এবং মানুষের জীবনকে আরও উন্নত করতে পারে—এমন বাস্তব প্রযুক্তি নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।”

উত্তর মেরুতে পৌঁছানোর পর অংশগ্রহণকারীরা পৃথিবীর সর্বউত্তর প্রান্তের ৯০ ডিগ্রি বিন্দুর চারপাশে একটি প্রতীকী বৃত্তাকার নৃত্যে অংশ নেন। এতে বাশকোর্তোস্তানের জনপ্রিয় সংগীত দল ‘এ ওয়াই ইয়োলা’ (AY YOLA) সংগীত পরিবেশন করে।

অভিযানে একটি সৃজনশীল প্রকল্পও ছিল। সমুদ্রযাত্রার সময় শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ফিকশন লেখক সের্গেই লুকিয়ানেনকোর সঙ্গে যৌথভাবে একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি তৈরি করে। গল্পটি পরবর্তী সময়ে রোসাটমের ‘আইসব্রেকার অব নলেজ’ প্রকল্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলোতে প্রকাশ করা হবে।

‘আইসব্রেকার অব নলেজ’ রোসাটমের সহায়তায় পরিচালিত একটি বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষামূলক প্রকল্প। তরুণদের প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও পারমাণবিক প্রযুক্তি সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলা, মেধাবী শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করা, তাদের সক্ষমতা বিকাশ এবং ক্যারিয়ার সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেওয়াই এ প্রকল্পের লক্ষ্য।

গত সাতটি মৌসুমে ‘আইসব্রেকার অব নলেজ’ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৪৭০ জনেরও বেশি মেধাবী স্কুল শিক্ষার্থীকে আর্কটিক ও উত্তর মেরু ভ্রমণের সুযোগ করে দিয়েছে।

রাশিয়া বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র দেশ, যার সক্রিয় পারমাণবিকচালিত আইসব্রেকার বহর রয়েছে। ‘আইসব্রেকার অব নলেজ’-এর মতো বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষামূলক অভিযানের মাধ্যমে দেশটি তরুণদের আর্কটিক ও উত্তর মেরুর পরিবেশ সরাসরি দেখার পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দিচ্ছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 + eighteen =