বিশ্বকাপের শেষ চারে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ের সেরা চার দল, শিরোপার লড়াইয়ে ইউরোপ বনাম আর্জেন্টিনা

১০০টি ম্যাচের রোমাঞ্চ, অঘটন আর নাটকীয়তার পর ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ এখন শেষ চারের লড়াইয়ে। এবারের আসরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার দল—আর্জেন্টিনা, স্পেন, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড—সবাই সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন দৃশ্য খুব বেশি দেখা যায় না।

চারটি দলই এর আগে বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ের স্বাদ পেয়েছে। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা আর্জেন্টিনা ১৯৭৮, ১৯৮৬ ও ২০২২ সালে তিনবার বিশ্বকাপ জিতেছে। ফ্রান্স শিরোপা জিতেছে ১৯৯৮ ও ২০১৮ সালে। ইংল্যান্ডের একমাত্র বিশ্বকাপ ১৯৬৬ সালে, আর স্পেন প্রথম ও একমাত্র শিরোপা জেতে ২০১০ সালে।

অর্থাৎ, এবার যে দলই চ্যাম্পিয়ন হোক না কেন, বিশ্বকাপে নতুন কোনো দেশের অভিষেক হবে না; বরং শিরোপা উঠবে অভিজ্ঞ কোনো চ্যাম্পিয়নের হাতেই।

সেমিফাইনালে ১৫ জুলাই মুখোমুখি হবে ইউরোপের দুই শক্তিশালী দল ফ্রান্স ও স্পেন। অন্য সেমিফাইনালে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা খেলবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। দুই ম্যাচই বিশ্ব ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন অধ্যায় রচনা করতে পারে।

এবারের বিশ্বকাপে অবশ্য কয়েকটি বড় অঘটনও ঘটেছে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল শেষ ষোলোতে নরওয়ের কাছে হেরে বিদায় নেয়। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি বিদায় নেয় রাউন্ড অব ৩২ থেকেই। দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে গ্রুপ পর্বই পেরোতে পারেনি। আর চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি এবার মূল পর্বেই জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়।

একসময় বিশ্বকাপ মানেই ছিল দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-উরুগুয়ে এবং ইউরোপের জার্মানি ও ইতালির আধিপত্যের লড়াই। কিন্তু গত এক দশকে ইউরোপীয় ফুটবলে শক্তির ভারসাম্য বদলেছে। ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড ও পর্তুগালের মতো দলগুলো ধারাবাহিকভাবে নিজেদের শক্তিশালী করেছে। একই সময়ে ইতালি ও উরুগুয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী দলগুলো আগের ধার হারিয়েছে। ফলে বিশ্বকাপের শেষ চারেও এখন ইউরোপের আধিপত্য স্পষ্ট। এবারের সেমিফাইনালের চার দলের মধ্যে তিনটিই ইউরোপের।

ফ্রান্স ও স্পেনের সেমিফাইনালকে অনেকেই আগাম ফাইনাল হিসেবে দেখছেন। কিলিয়ান এমবাপ্পে, ওসমান ডেম্বেলের মতো তারকায় সমৃদ্ধ ফ্রান্স পুরো টুর্নামেন্টে ধারাবাহিক ফুটবল খেলেছে। অন্যদিকে ইউরোপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেন তরুণ ও অভিজ্ঞ ফুটবলারের সমন্বয়ে দুর্দান্ত ভারসাম্যপূর্ণ একটি দল গড়ে তুলেছে।

অন্য সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন পরীক্ষা। কেপ ভার্দে, মিসর ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কঠিন লড়াই পেরিয়ে শেষ চারে এসেছে লিওনেল মেসির দল। এবার তাদের প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড—শারীরিকভাবে শক্তিশালী, কৌশলগতভাবে পরিণত এবং বড় ম্যাচে অভিজ্ঞ একটি দল।

বিশ্বকাপের শেষ চার মানেই ব্যক্তিগত তারকাদেরও লড়াই। মেসির সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বের বিপরীতে ইংল্যান্ডের ভরসা অধিনায়ক হ্যারি কেইন। একই সঙ্গে জুড বেলিংহাম, কিলিয়ান এমবাপ্পে ও স্পেনের তরুণ প্রজন্মও সেমিফাইনালে পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন।

বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনাকে ফাইনালের সম্ভাব্য দাবিদার মনে হলেও স্পেন ও ইংল্যান্ডকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। আধুনিক ফুটবলে শক্তির ব্যবধান আগের তুলনায় অনেক কমে এসেছে। ছোট ছোট মুহূর্ত, কৌশলগত সিদ্ধান্ত কিংবা ব্যক্তিগত নৈপুণ্যই এখন বড় ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে।

আর মাত্র দুটি ম্যাচের পরই শেষ হবে এক মাসব্যাপী এই বিশ্বকাপ উৎসব। কোটি কোটি দর্শকের মতো ফুটবলপ্রেমীরাও অপেক্ষা করছেন আরও দুটি স্মরণীয় লড়াইয়ের জন্য। শেষ পর্যন্ত যে দলই শিরোপা জিতুক, সেটি যেন হয় মাঠের সেরা দলের প্রাপ্য—এটাই ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

sixteen + 18 =