ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দাপটের সঙ্গে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতল অস্ট্রেলিয়া

সালেক সুফী

পারল না বাংলাদেশ। টানা দুই ম্যাচ হেরে এক ম্যাচ হাতে রেখেই টি-টোয়েন্টি সিরিজ খুইয়েছে স্বাগতিকরা। ক্রিকেট ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, বড় দলগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দ্রুত ভুল শুধরে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। অস্ট্রেলিয়া আবারও সেই পরিচয় দিয়েছে।

ওয়ানডে সিরিজে ১-২ ব্যবধানে পরাজয়ের পর অসাধারণ প্রত্যাবর্তন করেছে অস্ট্রেলিয়া। দ্বিতীয় ওয়ানডের পর থেকেই নিজেদের পরিকল্পনা ও কৌশলে পরিবর্তন এনে তারা টানা তিনটি ম্যাচ জিতে টি-টোয়েন্টি সিরিজ নিজেদের করে নিয়েছে। এখন তাদের সামনে বাংলাদেশের বিপক্ষে ধবলধোলাইয়ের সুযোগও তৈরি হয়েছে।

ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দিয়েছে বাংলাদেশ

প্রথম টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ে চরম ব্যর্থ হয়েছিল। দ্বিতীয় ম্যাচে ভুল একাদশ নির্বাচন এবং নেতৃত্বের কিছু প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হয়েছে দলকে।

সিরিজে টিকে থাকার ম্যাচে বাংলাদেশের উচিত ছিল নিজেদের সেরা একাদশ নিয়ে মাঠে নামা। প্রথম ম্যাচে আব্দুল গাফ্ফার সাকলায়েনকে সুযোগ দেওয়া যৌক্তিক ছিল। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে তাসকিন আহমেদ, নাহিদ রানা ও মুস্তাফিজুর রহমানকে নিয়ে আক্রমণ সাজানোই বেশি কার্যকর হতো।

সবচেয়ে বড় ভুল ছিল নবীন সাকলাইনের হাতে নতুন বল তুলে দেওয়া। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এমন আক্রমণাত্মক ব্যাটিং লাইনের বিপক্ষে তাকে দিয়ে বোলিং শুরু করানো ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল। চার ওভারে ৫৩ রান দিয়ে তিনি চাপে পড়ে যান। এতে তার আত্মবিশ্বাসেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ধীরগতির ও টার্নিং উইকেটে রিশাদ হোসেনও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। সাকলাইন ও রিশাদের আট ওভারে ৯৯ রান তুলে নেয় অস্ট্রেলিয়া। মূল ব্যবধানটিও তৈরি হয়েছে সেখানেই।

মাট রেনসের দুর্দান্ত ইনিংসে বড় সংগ্রহ

পুরো সফরজুড়েই ব্যাট ও বলে দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন মাট রেনস। এবার খেলেছেন ৫২ বলে অপরাজিত ৮৯ রানের ম্যাচজয়ী ইনিংস। টিম ডেভিডের ৪৫ রানের সঙ্গে তার ৯৭ রানের চতুর্থ উইকেট জুটি অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করায়।

অস্ট্রেলিয়ার ১৯৬ রানের ইনিংসে ছিল ১১টি ছক্কা ও ১০টি চার। অর্থাৎ ১০৬ রান এসেছে শুধু বাউন্ডারি থেকেই। যখন সাকলাইন ধারাবাহিকভাবে মার খাচ্ছিলেন, তখন সৌম্য সরকারকে দিয়ে কয়েক ওভার বোলিং করানো যেতে পারত। কিন্তু সে বিকল্প ব্যবহার করা হয়নি।

ভালো শুরু করেও সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ

বাংলাদেশের ব্যাটিং শুরুটা ছিল দারুণ। ৩.৪ ওভারে ৪৮ রান তুলে দল শক্ত ভিত তৈরি করেছিল। সাইফ হাসান ও তানজিদ হাসান তামিম দুজনই ছন্দে ছিলেন। তাদের অন্তত একজন যদি ১৫ ওভার পর্যন্ত ক্রিজে থাকতে পারতেন, তাহলে ম্যাচের ফল ভিন্ন হতে পারত।

সাইফ ৪২ ও তামিম ৩০ রান করে ফিরলে পারভেজ ইমন ৩৬ এবং তাওহীদ হৃদয় ৩৫ রান করে লড়াই চালিয়ে যান। তবে কেউই ম্যাচজয়ী ইনিংস খেলতে পারেননি।

বাংলাদেশের অন্তত পাঁচজন ব্যাটার ভালো সূচনা পেয়েছিলেন, কিন্তু কেউ সেটিকে বড় ইনিংসে রূপ দিতে পারেননি। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে মাট রেনস একাই ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন। এখানেই বাংলাদেশের সঙ্গে বড় দলগুলোর মূল পার্থক্য।

এখনও শেখার অনেক কিছু বাকি

অস্ট্রেলিয়ার সিরিজ জয় আমাকে বিস্মিত করেনি। যারা মনে করেন বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সব ফরম্যাটে নিয়মিত জিতবে, তাদের সঙ্গে আমি একমত নই।

ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বাংলাদেশের এখনও অনেক কিছু শেখার আছে। বড় দলগুলো চাপের মুহূর্তে নিজেদের সেরাটা বের করে আনে, ভুল থেকে শিক্ষা নেয় এবং দ্রুত মানিয়ে নেয়। বাংলাদেশকে সেই মানসিকতা অর্জন করতে হবে।

এখন দলের লক্ষ্য হওয়া উচিত শেষ ম্যাচে ঘুরে দাঁড়িয়ে ধবলধোলাই এড়ানো।

ভবিষ্যতের সম্পদ খুঁজে পেয়েছে অস্ট্রেলিয়া

এই সফর থেকে অস্ট্রেলিয়া নতুন বিকল্প খেলোয়াড়ও খুঁজে পেয়েছে। কুপার কনোলি ও মাট রেনস নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতের জন্য শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছেন।

একটি প্রশ্ন থেকেই যায়

একটি বিষয় বোধগম্য নয়। স্পোর্টিং উইকেটে সাফল্য পাওয়ার পরও বাংলাদেশ কেন চট্টগ্রামে একই ধরনের প্রতিযোগিতামূলক উইকেট তৈরি করল না?

নিজেদের ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে হলে দেশের মাঠে আন্তর্জাতিক মানের স্পোর্টিং উইকেট তৈরির বিকল্প নেই। তবেই বড় দলগুলোর বিপক্ষে নিয়মিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সম্ভব হবে।

সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড

অস্ট্রেলিয়া – ১৯৬/৫ (২০ ওভার)

মাট রেনস ৮৯*, টিম ডেভিড ৪৫, মিচেল মার্শ ২০।

নাসুম আহমেদ ২/২৭, নাহিদ রানা ১/৩৬, মুস্তাফিজুর রহমান ১/৩৪, আব্দুল গাফ্ফার সাকলায়েন ১/৫৩।

বাংলাদেশ – ১৮৯/৬ (২০ ওভার)

সাইফ হাসান ৪২, পারভেজ ইমন ৩৬, তাওহীদ হৃদয় ৩৫, তানজিদ হাসান তামিম ৩০।

অ্যারন হার্ডি ২/৪০, মাট রেনস ১/১৩, জোয়েল ডেভিস ১/২১।

ফল: অস্ট্রেলিয়া ৭ রানে জয়ী।

সিরিজ: অস্ট্রেলিয়া ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে।

ম্যাচসেরা: মাট রেনস।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

seventeen − 11 =