সচেতনা বাড়িয়ে এলপিজি দুর্ঘটনা ৮৫ ভাগ কমিয়ে আনা সম্ভব: রাউন্ড টেবিলে বক্তারা

বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন, কেবলমাত্র সচেনতা বৃদ্ধির মধ্যমে এলপিজি দুর্ঘটনা ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। বলা হয়েছে, এলপিজি খাতে সেফটি নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ রেগুলেশন প্রণয়ন অতি জরুরি। তবে তার বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। আলোচনায় উঠে আসে এলপিজি খাতের সকল পর্যায়ে নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ (কমপ্লাসেন্স) নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। আর তা নিশ্চিত করার জন্য প্রণোদনা চালু করা যেতে পারে। তুরস্কের নিরাপত্তাবিধি কথা উল্লেখ করে বলা হয়, বাংলাদেশও রোড ট্যাংকার চালক এবং অটোগ্যাস স্টেশন অপারেটরদের জন্য লাইসেন্সিংয়ের প্রথা চালু করা যেতে পারে।

‘বাংলাদেশের এলপিজি খাত ক্রমবর্ধতান নিরাপত্তা ঝুঁকি ও রেগুলেটরি চ্যালেঞ্জের মুখে’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা উপরের মতামত তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), এলপিজি অপারেটর এসোসিয়েশন বাংলাদেশ (লোয়াব) এবং এনার্জি এন্ড পাওয়ার যৌথভাবে এই গোলটেবিল বৈঠকে আয়েজন করে।

আজ রবিবার বিআইসি’র সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এই গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ড. ইয়াসির আরাফাত খান। আলোচনায় অংশ নেন বিইআরসির সদস্য ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া, জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব একেএম ফজলুল হক, রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট বরকত উল্লাহ, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক (পরিকল্পনা) ইকবাল বাহার বুলবুল, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সহকারী ইনস্পেক্টর মোহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান, লোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক, লোয়াব সিনিয়র সহ-সভাপতি হুমায়ুন রশীদ, বাংলাদেশ অটোগ্যাস এলপিজি স্টেশন এন্ড কনভারশন ওয়াকশপ ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি ইঞ্জি সিরাজুল মাওলা, ইউনাইটেড আইগ্যাসের এলপিজির চিফ ফিনানশিয়াল অফিসার ওসমান চিলিক, বসুন্ধরা গ্রুপের জাকারিয়া জালাল, মেঘনা ফ্রেস এলপিজির আবু সাইদ রাজা, সাইদুল ইসলাম, ওরিয়ন এলপিজির মহিউদ্দিন খালেদ, বেক্সিমকো এলপিজির মেহেদী হাসান প্রমুখ।

জালাল আহমেদ বলেন, মূল প্রবন্ধে যথাযথভাবেই উল্লেখ্য করা হয়েছে যে নিরাপত্তা বিধি মানার সংস্কৃতি আমাদের এখানে অনুপস্থিত। ফলে এই বিধিমালা মেনে চলার জন্য সচেতনতা সৃষ্টি এবং এই খাতের জনবলকে প্রশিক্ষিত করার লক্ষ্যে বিইআরসি লোয়াবসহ সকল অংশীজনদের সাথে নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। তিনি বলেন, এলপিজি নীতিমালা সংশোধন করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তাতে শুরু থেকেই অংশীজনদের মতামত নেওয়া উচিত।

লোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, আমরা নিরাপত্তা বিধিমালা পুরোপুরি অনুসরণ করেই ব্যবসা পরিচালনা করতে চাই। লোয়াব এবং তার সদস্যরা দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে। আগামীতে বিইআরসির নেতৃত্বে সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম এবং জনবলের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করতে আগ্রহী। তিনি প্রত্যাশা করেন বিইআরসি এই বিষয়ে উদ্যোগ নেবে।

বিইআরসি সদস্য সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া বলেন, এলপিজি খাত ক্রমবিকাশমান। কিন্তু নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। এই কাজটি সমন্বিতভাবে করার জন্য বিইআরসি ইতোমধ্যে নিরাপত্তা বিধিমালার খসড়া প্রণয়ন করেছে। অংশীজনদের সাথে কথা বলে এটি চূড়ান্ত করা হবে। তবে খাতসংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক অংশগ্রহণ ছাড়া এলপিজি খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

মূল প্রবন্ধে প্রফেসর ইয়াসির আরাফাত খান সম্প্রতিক সময়ের এলপিজি ও অটোগ্যাস দুর্ঘটনার কিছু উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এলপিজি খাতের দুর্ঘটনা ৮০-৮৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে প্রতিটি দুর্ঘটনার সঠিক কারণ অনুসন্ধান করে আগামীতে এই ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। মূল প্রবন্ধে অংশীজনদের করণীয় হিসেবে তিনি ১৭টি সুপারিশ তুলে ধরেন। বলেন, এগুলো থেকে বেরিয়ে আসার জন্য দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। নিরাপত্তা বিধিমালা সুনির্দিষ্ট করে তা কার্যকর করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।

একেএম ফজলুল হক বলেন, সরকার এলপিজি নীতিমালা সংশোধন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অংশীজনদের মতামত নিয়ে এটি চূড়ান্ত করা হবে। এখানে নিরাপত্তা বিধি এবং তা প্রতিপালনে দায়দায়িত্ব নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বরকত উল্লাহ বলেন, আমরা ভবন নির্মাণের সময় ফায়ার সার্ভিসের কাছ থেকে অনুমোদন গ্রহণ করি। কিন্তু সেখানে এখনো এলপিজি সিলিন্ডার ও রেটিকুলেশন সিস্টেমের জন্য কী ধরনের নকশা করা দরকার তার গাইডলাইন নেই। সরকারের পক্ষ থেকে এটার জন্য নিরাপত্তা গাইডলাইন দিলে আগামীতে তা অনুসরণ করা হবে।

ইকবাল বাহার বুলবুল বলেন, তৈরি পোশাক খাতে নিরাপত্তা বিধিমালা অনুসরণ করার কারণে এখানে দুর্ঘটনা অনেক কমে এসেছে। অন্যদিকে আবাসিক খাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে যারা এলপিজি ব্যবহার করেন, তারা এর নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে সচেতন নন। তাই দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য তাদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে হোস পাইপ ও রেগুলেটর থেকে বেশি দুর্ঘটনা হয়। ফলে এগুলোর মান নিশ্চিত করতে হবে।

মেহেদী ইসলাম খান বলেন, এলপিজি খাতের নিরাপত্তা বিধি অনুসরণ করার বিষয়টি দেকভাল করার দায়িত্ব বিস্ফোরক অধিদপ্তরের। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের জনবল মাত্র ১১ জন। ইতোমধ্যে নানা পর্যায়ে নকশা অনুমোদন করার জন্য বুয়েট ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো হচ্ছে। আর আমদানিসহ বিভিন্ন অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টি অনলাইন নির্ভর করা হয়েছে। তিনি আশা করেন আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তাদের পুরো সেবা ডিজিটাইজ করা সম্ভব হবে।

জাকারিয়া জালাল, বলেন বিশ্বের রান্নার জন্য সবচেয়ে বেশি এলপিজি ব্যবহার হয় ভারতে। সেখানে মোট গ্রাহক সংখ্যা ৩০০ মিলিয়ন। সেখানে এলপিজি খাতের পুরো নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করে স্পেসো নামের একটি প্রতিষ্ঠান। যার জনবল ২ লাখ ৫৬ হাজার।

সাইদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে ক্রস ফিলিং একটি বড় সমস্যা। ইতোমধ্যে অটোগ্যাস স্টেশন মালিকদের পক্ষ থেকে তাদের রিফিলিংয়ের সুযোগ দেওয়া দাবি উঠেছে। তার এই সুযোগ দেওয়া হলে এলপিজির নিরাপত্তায় বড় ধরনের স্খলন হবে।

ওসমান চিলিক বলেন, নিরাপত্তা বিধিমালা কেবল কাগজে থাকলে হবে না। তা মাঠ পর্যায়ে চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি তুরস্কের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে এলপিজি দুর্ঘটনার মাত্র ৫ শতাংশ হয় সিলিন্ডার দুর্ঘটনার কারণে। আর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য সেখানে সিলিন্ডার বীমা চালু আছে। যা বাংলাদেশ অনুসরণ করতে পারে। তিনি বলেন, বাল্ক এলপিজি পরিবহনে নিয়োজিত যানবাহন চালকদের উচ্চতর প্রশিক্ষণসহ ভিন্ন লাইসেন্স দেওয়া জরুরি। আবার অটোগ্যাস স্টেশনের অপারেটদেরও লাইসেন্স দেওয়া উচিত।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

16 + thirteen =