অস্ট্রেলিয়া -বাংলাদেশ ডাচ বাংলা ওডিআই সিরিজ – বদলে যাওয়া বাংলাদেশে উড়িয়ে দিলো অস্ট্রেলিয়াকে 

সালেক সুফী

অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ ডাচ বাংলা দ্বিপাক্ষিক ওডিআই সিরিজের প্রথম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া বদলে যাওয়া বাংলাদেশের কাছে বৃষ্টি বিঘ্নিত প্রথম ম্যাচে ডাকওয়ার্থ লুইস পদ্ধতি হিসাবে ৮৬ রানে হেরে ০-১ ম্যাচে পিছিয়ে রইলো। টস হেরে সবুজ ঘাসে ঢাকা উইকেটে মেঘে ঢাকা আকাশের নিচে পরিকল্পিত ব্যাটিং করে ২৮৪/৮ করেছিল বাংলাদেশ। বোলিং সহায়ক স্পোর্টিং উইকেটে নাহিদ রানা, মুস্তাফিজ, তাসকিন বোলিং তোপে ৪২.২ ওভারে ১৯১/৯ করে নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে কাঁপছিলো অস্ট্রেলিয়া। বৃষ্টি এসে খেলায় বাকি সময় ধুয়ে নেয়ায় অগত্যা ডাকওয়ার্থ লুইস হিসাবে ৮৬ রানে জয় পায় বাংলাদেশ।

এর আগে দুই দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত ওডিআই ম্যাচে মাত্র একবার ২০০৫ সালে ইংল্যান্ডের কার্ডিফে তরুণ মোহাম্মদ আশরাফুলের বীরত্বে হেরেছিল রিকি পন্টিংয়ের বিশ্ব জয়ী দল। এবারের অস্ট্রেলিয়া দলে নেই পত কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, জস হেজেলউড, স্টিভ স্মিথ, ট্রাভিস হেড, মিচেল মার্শ বা গগ্লেন ম্যাক্সওয়েল। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া নাম যে দলটি খেলতে এসেছে সেখানে বর্তমানে অস্ট্রেলীয় ঘরোয়া ক্রিকেটে সক্রিয় উঁচু সারির প্রতিভাবান খেলোয়াড় রয়েছে। আর মিরপুরের সবুজ ঘাসে ঢাকা পেসি বাউন্সি উইকেটে খেলার বিস্তর অভিজ্ঞতা ওদের রয়েছে। এহেন উইকেটে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিংয়ে সবক্ষেত্রেই উন্নততর ক্রিকেট খেলে দাপুটে জয় তুলে হতবাক করেছে ক্যাঙ্গারু বাহিনীকে।

নিজেদের ইনিংসের সূচনায় বাংলাদেশ ১০ রানের মাথায় ওপেনার সাইফ হাসানকে হারিয়ে বিপদে পড়েছিল। ব্যাক্তিগত ৯ রানের মাথায় ফিরে যেতে পারতো নাজমুল শান্ত। এলিসের বলে স্লিপে ক্যাচ ফেলে দেয় মার্নাস লেবুসাং। উইকেট আর আবহাওয়ার সহায়তা নিয়ে দারুন বোলিং করছিলো অস্ট্রেলিয়র নাথান এলিস, জাভিয়ার বার্টলেট। শান্ত -তানজিদ জুটি দেখে শুনে দৃঢ়তার সঙ্গে ৯৬ রানের জুটি গড়ে তুলে দলের ইনিংসকে শক্ত ভিত্তি দেয়। দ্বিতীয় স্পেলে এসে এলিস ৫৪ রান করা তানজিদ তামিমকে ফিরিয়ে দিলে বাংলাদেশ ইনিংস কিছুটা গতি হারায়। তরীঘরি করে অকারণ স্ট্রোক পার্টটাইম স্পিনার রেনসর বলে ৭ রানে ফিরে যায় লিটন। ভালো খেলতে থাকা শান্ত মেজাজ হারিয়ে ৬৭ রান করে রেনসকে উইকেট উপহার দিলে বাংলাদেশ ইনিংস কিছুটা গতি হারায়। সৌভাগ্য কাল দীর্ঘ ৪ বছর পর দলে ফিরে দলকে কাঁধে তুলে নেয় ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত সফল মোসাদ্দেক সৈকত। সঙ্গী ছিল কিছুটা নিষ্প্রভ তাওহীদ হৃদয়। ৫ম উইকেট জুটিতে যোগ হয় মূল্যবান ৭৫ রান। অধিনায়ক মেহেদী মেরাজ আবারো ব্যাট হাতে ব্যর্থ হলেও লেট্ মিডল অর্ডার আর লেট্ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের সঙ্গী করে সৈকত তার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট জীবনের সর্বোচ্চ স্কোর  (৭০ বলে অপরাজিত ৮৬ ) করে দলকে স্বস্তির স্থানে পৌঁছে দেয়। কাল দৃষ্টিকটু ছিল সচরাচর তুখোড় ফিল্ডিং করা অস্ট্রেলিয়ার ছন্নছাড়া ফিল্ডিং। বেশ কিছু ক্যাচ ফস্কায়, রান আউটের সুযোগ হারায় বিবর্ণ অস্ট্রলিয়া। নাহয় বাংলাদেশের স্কোর ২৫০ সীমিত রাখার সুযোগ ছিল। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ভালো বোলিং করেছে নাথান এলিস (৩/৩৮), মাট রেনেশ (২/৩৫)। কাল বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের সময় অস্ট্রেলিয়া দলকে ছন্নছাড়া অপরিচত মনে হয়েছে। সহজ ক্যাচ ধরতে পারেনি, রান আউটের সুযোগ হারিয়েছে।

অস্ট্রেলিয়া ইনিংসের সূচনায় দুর্দান্ত প্রথম বলেই আঘাত হেনে তাসকিন ফিরিয়ে দেয় ম্যাথিউ সর্টকে। দ্বিতীয় ওভারে মুস্তাফিজ লেবুশানকে এলবিডব্লু ফাঁদে ফেলে দিলে ২রানে ২ উইকেট হারিয়ে দিশে হারায় অস্ট্রেলিয়া। জস ইংলিশকে সাথী করে কুপার কলোনী ইনিংস মেরামতের কাজ শুরু করলেও উদীয়মান গতি দানব নাহিদ রানার আবির্ভাবে দ্রুত পাল্টে যায় চিত্র। ১৪০-১৫০ কিলোমিটার গতির পাঁজর বরাবর উঠে আসা বল খেলতে অস্বস্তিতে পড়ে ক্যাঙ্গারু বাহিনী। ১০ ওভারের প্রতিটি বল নাহিদ ১৪০+ কিলোমিটার গতিতে নিদৃষ্ট চ্যানেলে করেছে। নাহিদ ৪১ রানে ৪ উইকেট তুলে নেয়ায় পথ হারায় অস্ট্রেলিয়া। অপরদিকে ৪ বছর দলে ফেরা মোসাদ্দেক কার্যকরী স্পিন বোলিংয়ে তুলে নেয় ৩৭ রানে ২ উইকেট। মাত্র ৫.২ ওভার বোলিং করে মুস্তাফিজ ২৪ রানে নিয়েছে ২ উইকেট। অস্ট্রেলিয়া যখন ১৯১ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে নিশ্চিত পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে তখন আকাশ ভেঙে নাম বৃষ্টি। খেলার ফলাফল নির্ধারিত হয় ডাকওয়ার্থ লুইস পদ্ধতিতে। ২০০৫র  ২১ বছর পর বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ওডিআই ম্যাচ জয় করে ৮৬ রানে। দুই দলের ভারসাম্যের ব্যাবধান দেখে অনুমান করলে ভুল হবে না বাংলাদেশ সিরিজ জিতে নিবে। তবে প্রতিপক্ষ যখন অস্ট্রেলিয়া তখন কিছুই নিশ্চিতভাবে ধরে নেয়া ঠিক হবেনা।

যতই দেখছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি নাহিদ রানাকে দেখে। আমি চিরদিন গতিময় পেস বোলারদের অনুরাগী। ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্বর্ণযুগের পেস  বলার ওয়েসলি হল, চার্লি গ্রিফিথ থেকে শুরু করে মার্শাল, রবার্টস, হোল্ডিং, গার্নার, ওয়ালশ, পাকিস্তানের ইমরান, ওয়াসিম, ওয়াকার, শোয়েব, অস্ট্রেলিয়ার লিলি, টমসন, সাম্প্রতিক সময়ের স্টার্ক, কামিন্স, হেজেলউডদের খেলা দেখেছি। এখনই নাহিদকে সেই স্তরে নিবোনা। কিন্তু যে বোলার বাংলাদেশ উইকেটে গতির ঝড় তোলে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিলণ্ড, দক্ষিণ আফ্রিকায় সে যে বিধ্বংসী হবে বলা যেতেই পারে। কাল ম্যাচ শেষে আলেক্স কারী বিগ বাসে নাহিদকে তার দল এডিলেড স্ট্রাইকার্সে খেলার আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

কিছু বলবো মোসাদ্দেক সৈকতকে নিয়ে। একসময় সাকিব আল হাসানের আড়ালে শুরু করেছিল। ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত আলো ছড়ালেও নির্বাচকদের অবহেলায় পরে ক্যারিয়ার অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। স্বরূপে দারুন ভাবে ফিরে আসা কালকের ম্যাচটি সৈকতের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। বাংলাদেশের মিডল অর্ডারে একজন কুশলী চৌকষ খেলোয়াড় ফিরে আসলো। জাতীয় দলের নির্বাচক হাবিবুল বাসার সুমনকে সাধুবাদ জানাবো।

সংক্ষিপ্ত স্কোর কার্ড:

বাংলাদেশ ২৮৪/৮ (মোসাদ্দেক হোসাইন সৈকত ৮৬*, নাজমুল হোসেন শান্ত ৬৭, তানজিদ হাসান তামিম ৫৪, তাওহীদ হৃদয় ৩১, তাসকিন আহমেদ ২০, নাথান এলিস ৩/৩৮, মাট রেনস ২/৩৫, লিয়াম স্কট ২/৫৭)।

অস্ট্রেলিয়া ৪২.২ ওভারে ১৯১/৯ (ক্যামেরুন গ্রিন ৫২*, আলেক্স কারী ৪৭, কুপার কলোনি ৩৫, নাহিদ  রানা ৪/৪১, মুস্তাফিজুর রহমান ২/২৪, মোসাদ্দেক হোসাইন সৈকত ২/ ৩৭), ডাকওয়ার্থ লুইস পদ্ধতিতে।

বাংলাদেশ ৮৬ রানে জয়ী।

ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়: মোসাদ্দেক হোসাইন সৈকত।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ten + five =