কার্ডিফ থেকে মীরপুর

সালেক সুফী

কাল বৃষ্টিস্নাত বর্ষা সন্ধ্যায় মীরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক ওডিআই ম্যাচ জয় দলের সাথে সংযুক্ত মোহাম্মদ আশরাফুল আর নাফিস ইকবালকে ২০০৫ কার্ডিফ স্মতিকাতর করেছিল। ২০০৫ ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত অস্ট্রেলিয়া ইংল্যান্ড বাংলাদেশ তিন জাতির ওডিআই সিরিজে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল সেই সময়ের তরুণ আশরাফুলের মহাকাব্যিক শতরানকে পুঁজি করে। সেই দলের ওপেনার ছিল নাফিজ ইকবাল। ২০০৫ -২০২৬ দীর্ঘ ২১ বছরে মাত্র ২৩ ওডিআই ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। ২০ ম্যাচ জিতেছে অস্ট্রেলিয়া, ব্রিসবেনে অনুষ্ঠিতব্য ২০১৫ বিশ্বকাপের ১ ম্যাচ জয় পরাজয় ছাড়া বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হয়েছে। কাল নিয়ে ২ ম্যাচ জিতেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ স্কোর ছিল ৩৮১ বাংলাদেশের ৩৩৩। অস্ট্রেলিয়ার সর্বনিম্ন স্কোর ১৯১ বাংলাদেশের ৭৪। ২০০৫ রিকি পন্টিং নেতৃত্বের অস্ট্রেলিয়া ছিল সর্বজয়ী সর্ব যুগের অন্যতম সেরা দল। এখনো অস্ট্রেলিয়া সকল ফরম্যাটেই শীর্ষ তিন দলের একটি। এবারের দলটিতে প্রথম চয়েস বেশ কয়েকজন না থাকলেও দলটিকে কিছুতেই খর্ব শক্তির বলা যাবেনা। বাংলাদেশ বৃষ্টি বিঘ্নিত ম্যাচটি দাপটের সঙ্গেই ৮৬ রানে জিতেছে ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে। এই দলটির ব্যাটিং কোচ সেই কার্ডিফ নায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল। আর ম্যানেজার নাফিস ইকবাল। বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম মোড়ল অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের বিরুদ্ধে দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট খেলতে খুব একটা আগ্রহী হয়না। নিজেদের দেশে (অস্ট্রেলিয়ায়) সচরাচর আমন্ত্রণ জানায় না। সেই অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে যেভাবে স্পোর্টিং উইকেটে একচেটিয়া ক্রিকেট খেলে বাংলাদেশ কাল জয় পেয়েছে সেটি বদলে যাওয়া সাহসী বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার মাইলফলক। এই জয়ের জন্য অবশ্যই আমি বাংলাদেশ ক্রিকেটের পরিবর্তিত মানসিকতাকে কৃতিত্ব দিবো। অস্ট্রেলিয়ার এই দলটিকে মাত্র কিছু দিন আগে পাকিস্তান লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে ধীর ঘূর্ণি উইকেটের ফাঁদে ফেলে সিরিজে হারিয়েছে। বাংলাদেশ কিন্তু মীরপুরে সবুজ ঘাসের আচ্ছাধনে ঢাকা বাউন্সি উইকেটে খেলেছে। অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব অস্ত্রে ওদের ঘায়েল করেছে। এর আগেও বাংলাদেশ বাংলাদেশে অস্ট্রেলিয়াকে টেস্ট এবং টি ২০ ম্যাচে হারিয়েছে। কিন্তু সেই উইকেট গুলো নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। এবার কিন্তু কোন অজুহাতের সুযোগ নেই। অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম সেরা খেলোয়াড় আলেক্স কারী ম্যাচ শেষে কালকের ম্যাচ জয়ের অন্যতম নায়ক বিস্ময় প্রতিভা নাহিদ রানার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তানজিদ তামিম, নাজমুল শান্ত, মোসাদ্দেক হোসেন, মুস্তাফিজ, তাসকিন সবাই কাল একসঙ্গে জয়ের নেশায় জ্বলে উঠেছিল। বাংলাদেশ দলের রসায়ন বলে দেয় জয় ক্ষুধার্ত বাংলাদেশ হয়ত ওডিআই সিরিজে ক্যাঙ্গারু ওয়াশ করবে।

সম্প্রতি পাকিস্তান দলকে টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করার পর কিছু ভারতীয় ক্রিকেটার বন্ধু সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছে ভারতের রাজ্য দলগুলো নাকি বাংলাদেশকে সহজে হারিয়ে দিবে। ওদের কি মনে নেই ২০০৭ আইসিসি বিশ্ব কাপে তখনকার উদীয়মান বাংলাদেশ ভারতের স্বপ্ন চূর্ণ করেছিল। ২০১৫ ধোনীর ভারতকে ওডিআই সিরিজে ২-১ হারিয়েছিল। কয়েকবছর আগে মীরপুরে টেস্ট ম্যাচে প্রায় হারিয়ে দিয়েছিলো। যেভাবে বাংলাদেশ ম্যাচের পর ম্যাচ এগিয়ে যাচ্ছে ভারতকে আসন্ন সাদা বলের দ্বিপাক্ষিক সিরিজে হারিয়ে দিবে না নিশ্চিত করে বলা যাবেনা।

এই বাংলাদেশ নিয়ে আশাবাদী হওয়া যেতেই পারে। তবে কালকের ম্যাচেও কিছু ভুল ত্রুটি হয়েছে। সময় হয়েছে মারকুটে সৌম্য সরকারকে আবারো সুযোগ দেয়ার। মোসাদ্দেক নিজের প্রতিভা নিয়ে ফিরে আসায় আর মেহেদী মিরাজ সাদা বল ক্রিকেটে বিবর্ণ হয়ে পড়ায় পরের ম্যাচে রিশাদকে খেলানোর সুপারিশ করবো। ভবিষ্যতের কথা ভেবে নাহিদ রানা, তাসকিনদের লোড ম্যানেজমেন্ট করতে হবে।

সাফল্য সাফল্যের জন্ম দেয়। উদয়ের পথে বাংলাদেশকে আকাশের সীমানায় পৌঁছতে হবে। আপাতত সীমানা ২০২৭ ওডিআই বিশ্বকাপ। কাল ম্যাচ চলাকালে প্রিয় বন্ধু মং কিউ সিন (চোরি) স্মরণ করিয়েছে কার্ডিফ স্মৃতি। মাঠে থেকে চোরি কার্ডিফ জয় দেখেছে। ইতিহাসের ফিরে আসা উপভোগ করেছি কাল কুইন্সল্যান্ডের লোগান সিটিতে বসে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

five × two =