গ্যাস সংকট থেকে উত্তরণে বাস্তবভিত্তিক পথনকশা

সালেক সুফী

সাত আগস্ট বাংলাদেশে এসে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ চেইনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিবিড় আলোচনা এবং শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ হয়েছে। দূরদর্শী ও সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব এবং আমলানির্ভর, সিন্ডিকেট-কবলিত ভ্রান্ত কৌশলের পরিণতিতে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সংকট এখন মহামারির রূপ নিয়েছে। নতুন সরকারের আন্তরিকতার অভাব না থাকলেও বাস্তবতার নিরিখে ২০৩০ সালের আগে জ্বালানি-বিদ্যুৎ সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব। তবে জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন কাজ করা প্রকৃত অভিজ্ঞ সাবেক কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে উত্তরণের একটি বাস্তবভিত্তিক নীলনকশা প্রণয়ন করে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় এগোতে পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

গ্যাস কূপ খনন অনুসন্ধান জোরদার

পূর্ববর্তী সরকারের ৫০ ও ১০০ কূপ খনন কর্মসূচির বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে। বাপেক্স, বিজিএফসিএল ও এসজিএফসিএল সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান বাধা দীর্ঘ ডিপিপি অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা।

এ ক্ষেত্রে গ্যাস অনুসন্ধানকে সর্বোচ্চ জাতীয় গুরুত্ব দিয়ে গ্যাস অনুসন্ধান ও উন্নয়ন-সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোর ডিপিপি সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে প্যাকেজভিত্তিক অনুমোদন নিশ্চিত করা যেতে পারে।

শুনছি, প্রত্যাশী কোম্পানিগুলোকে গ্যাস অনুসন্ধান প্রকল্প অনুমোদনের আগে গ্যাস পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে বলা হয়। দেশ-বিদেশে গ্যাস অনুসন্ধানে নিয়োজিত বিশ্বের সেরা পেট্রোলিয়াম প্রকৌশলী ও ভূতত্ত্ববিদদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, পৃথিবীর কোথাও কোনো কোম্পানি খনন শেষে বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে গ্যাস আবিষ্কারের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। অনুসন্ধানে ঝুঁকি নিতেই হবে।

বাংলাদেশ হয়তো গ্যাস-তেলে ভাসছে না। কিন্তু সারা দেশে ২ডি ও ৩ডি সিসমিক সার্ভে করে বিশ্লেষণ না করা পর্যন্ত দেশের স্থলভাগের কোথায় গ্যাস রয়েছে তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তাই সারা দেশে চিরুনি অভিযান চালানোর মতো করে সিসমিক সার্ভে করা প্রয়োজন। এ পর্যায়ে সুরমা বেসিন, ব্লক-৭ ও ব্লক-৯-এ জরুরি ভিত্তিতে সিসমিক সার্ভে করা উচিত।

বর্তমানে চালু থাকা তিতাস, বাখরাবাদ, শ্রীকাইল ও মোবারকপুর গ্যাসক্ষেত্রের নতুন স্তরে গ্যাস পাওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তিতাসে সাফল্য পাওয়া গেলে সার্বিক চিত্রই পাল্টে যেতে পারে।

পেট্রোবাংলার খনন কোম্পানিগুলোতে কর্মরত দক্ষ কর্মকর্তাদের সুরক্ষা দেওয়ার সুপারিশ করছি। ঠুনকো কারণে যেন অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের হয়রানি করা না হয়।

default

এলএনজি আমদানি কার্যক্রম

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং সৌদি-ইয়েমেন সংঘাত বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় এ প্রক্রিয়া চলতে থাকলে জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যাহত হবে।

বিকল্প হিসেবে দ্রুত মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ব্রুনাইয়ের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি ক্রয় চুক্তি করা প্রাসঙ্গিক। একই সঙ্গে সরকারকে কূপমণ্ডূকতা থেকে বেরিয়ে এসে সামিটের সঙ্গে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের চুক্তি পুনর্বহালের বিষয়টি বিবেচনা করার সুপারিশ করছি।

বর্তমানে চীনা কোম্পানির সঙ্গে আলোচনাধীন চুক্তিটি আদৌ বাস্তবায়নযোগ্য হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এলএনজি নিয়ে কাজ করা সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয় রেখে সরকার ঝুঁকিতে পড়েছে।

ভূমিভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ

জানি না, সরকারপ্রধানকে কোন মহল পরামর্শ দিয়েছে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করতে সাত বছর সময় লাগবে। দেশে ও প্রবাসে গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের মাঠপর্যায়ে দীর্ঘ ৫০ বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি, পথস্বত্বে ব্যাপক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও জিটিসিএল সর্বোচ্চ তিন বছরের মধ্যে এই পাইপলাইন নির্মাণ করতে সক্ষম।

এখানে তিনটি নদী অতিক্রমে সাবমেরিন পাইপলাইন নির্মাণের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। কিছু জলাবদ্ধ এলাকায় সোয়াম্প বাগি ব্যবহার করা যেতে পারে। বাকি এক ডজন নদী ক্রসিং প্রচলিত HDD পদ্ধতিতে করা সম্ভব।

আমি নিজে ১৯৯৯-২০০০ সালে ভোলা-বরিশাল-খুলনা পাইপলাইন রুট পরিদর্শন করে পাইপলাইন নির্মাণের সুপারিশ করেছিলাম। ভোলার গ্যাস এলএনজি বা সিএনজি করে পরিবহন অথবা ভোলায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ সময়ের অপচয় হবে। সেখানে একটি ২০ বা ২৪ ইঞ্চি সঞ্চালন পাইপলাইন থাকলে ব্লক-৭ ও সংলগ্ন অঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে।

বাড়তি এলএনজি আমদানি সহজ করতে জিটিসিএলকে ফেনী-বাখরাবাদ ৪২ ইঞ্চি গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণে দুই বছর সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। মনে রাখতে হবে, এখানে ইতোমধ্যে একটি ২৪ ইঞ্চি এবং অপরটি ৩২ ইঞ্চি গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন চালু রয়েছে।

উচ্চচাপের পাইপলাইন থেকে নির্ধারিত দূরত্বে নতুন জমি অধিগ্রহণে ন্যূনতম ১২-১৬ মাস সময় প্রয়োজন। সরকার বিশেষ ব্যবস্থা নিলে এ সময় নয় মাসে নামিয়ে আনা সম্ভব। পাশাপাশি উপকরণ ক্রয় ও নির্মাণ ঠিকাদার নিয়োগে ন্যূনতম এক বছর সময় লাগবে। পাইপলাইন নির্মাণকাজে অন্তত দুইটি শুষ্ক মৌসুম প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে যথাযথ মান বজায় রেখে বাংলাদেশে নতুন কোনো ক্রস-কান্ট্রি গ্যাস সঞ্চালন লাইন নির্মাণে তিন বছরের কম সময় ধরা উচিত নয়। মহেশখালী থেকে চালু থাকা দুটি সঞ্চালন পাইপলাইন ১,৫০০-১,৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পরিবহন করতে পারবে। চট্টগ্রাম বিতরণ এলাকায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস বরাদ্দ রেখে আরও ৯০০-১,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে ব্যবহার করা সম্ভব।

আর যতই দক্ষ ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের ঠিকাদার নিয়োগ করা হোক, ২৪-৩০ মাসের আগে নতুন টার্মিনাল যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। যারা এর চেয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের কথা বলছেন, তাদের যুক্তি-তর্কে আসার আহ্বান জানাই।

আমার সর্বশেষ সুপারিশ—দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক কারণে হয়রানি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে আমি আমার পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিবাদ করব। আশা করি, কর্তৃপক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। আমার কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই; আছে শুধু দেশপ্রেম এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

14 − 5 =