ঢাকার পাড়া-মহল্লায় বাহারি খাবার

ভ্রমণ আর ভোজন যখন একসাথে যোগ হয় তখন মনে হয় ঘুরাঘুরিটা পরিপূর্ণ। ঢাকার রাস্তায় বাহারি রঙের খাবার চেখে পড়ে হরহামেশাই। খাবারের দাম, মান এবং নানান বিষয় সম্পর্কে জানাবো। আমাদের এবারের গন্তব্য ঢাকার খিলগাঁও এর তালতলা মার্কেট এলাকা। লিখেছেন গোলাম মোর্শেদ সীমান্ত

মার্কেটের ভিতরে প্রবেশ করতেই খোলা পরিবেশে দেখা গেলো বেশকিছু দোকান। যেখানে বিক্রি হচ্ছে:-
চিকেন ফ্রাই, পিজ্জা, রোল, সমচা, সিঙ্গড়া, রোল নানান ফাস্টফুড আর সঙ্গে রয়েছে গরম-গরম হালিম আর জিলাপি। মার্কেটের নিচ তলায় এক সারিতে রয়েছে বেশ কয়েকটি ফুচকার দোকান। মার্কেটে প্রবেশ করার পূর্বেই উল্টো পাশে চোখে পড়বে দুটো কাবাবের দোকান। কাবার খাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে এমন দৃশ্য দেখতে চাইলে যেতে পারেন আপনিও। আল আমিন কাবাব এবং শাহিন ভাইয়ের স্পাইসি কাবাব হচ্ছে দোকানের নাম। খানিকটা সামনে হাঁটতেই চোখে পড়লো একজন মৌসুমি ফল বিক্রি করতে। তার উল্টো পাশেই ডিম বিক্রি করছে আরেকজন। আরেকটু সামনে না যেতেই দেখলাম রিকশাওয়ালারা দল বেঁধে খাচ্ছে প্লেটে করে ঝালমুড়ি। ডান দিকে চোখ পড়লো একদল তরুণীর দিকে যারা ‘মামার’ হাতে বানানো ফুচকা খাচ্ছে অতিরিক্ত টক নিয়ে। রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় বেশ কিছু রেস্তোরাঁ চোখে পড়ে যেখানে দোকানের বাইরে চেয়ার দিয়েই বিক্রি করছে তাদের পণ্য। অনেকেই দেখছি দাড়িয়েই খাচ্ছে তাদের খাবারগুলো। চায়ের বাড়ি নাম শুনে সকলের মাথায় নিশ্চয়ই আসছে থাকার কোন জায়গা নাকি আবার। আসলে ঘটনাটা হচ্ছে ভিন্ন স্বাদের চায়ের পসরা সাজিয়েছে বিক্রেতা। খানিকটা সামনে যেতেই দেখলাম একটা ওপেন ক্যাফে নাম তার ঈধভব আড্ডা। নামের সাথে বাইরের দৃশ্যটাও একই? একটু ফাকে ফাকে বন্ধুরা মিলে খাওয়ার সাথে সাথে আড্ডাতেই মেতে উঠছে। নানান বিষয়ে হচ্ছে জমপেশ আড্ডা আর সঙ্গে হরেকরকমের খাবার তো চলছেই।
দাম কেমন?
কাবাবের দাম ১০০-২০০ টাকার মধ্যেই সবগুলো। ব্যতিক্রম শুধু ফিশ বার খাওয়ার জন্য এটার দাম পড়বে ২৫০ টাকা। এছাড়া কাবাবের সঙ্গে প্রতি পিস লুচি পাওয়া যাবে দশ টাকায়। ফাস্টফুডের দাম গুলো ১০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাবে প্রায় সবগুলো। মার্কেটর নিচে ফুচকা খেতে হলে দাম দিতে হবে ৫০ টাকা আর বাইরে ফুচকা এক প্লেট দিচ্ছে ২০ টাকায়। আনারস এক প্লেট বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকায়। চার ধরনের ডিম তালতলার রাস্তায় প্রতিটাই ২০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাবে। হরেকরকমের চা পাওয়া যায় চায়ের বাড়ী তে। চা খাওয়ার জন্য হাতে ১০০ টাকার কম রাখলেও চলবে পাশাপাশি বেশকিছু নাস্তা করার মতো খাবারো মেলে এখানে।
ভোজনরসিকের কথা?
মনসুর আলী একজন চাকরিজীবি হাতে ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন ফুচকার দোকানের সামনে? তার কাছে জানতে চাইলাম এসব খাবার গুলো তো অস্বাস্থ্যকর এবং রোগজীবাণুযুক্ত তবুও কেন বাসার জন্য নিচ্ছেন। তিনি সোজাসাপ্টা জানায় ভালো লাগে তাই খাই অন্য কিছুই জানিনা। আমি আর কথা না বাড়িয়ে অন্যদিকে গেলাম। একদল তরুণের দেখা পেলাম কাবাবের দোকানে তখন জানতে চাইলাম এসব কেন খাচ্ছো। তাদের মধ্যে তানভির নামে একজন জানায়; আমরা নামি-দামি রেস্তোরাঁ গুলোতেও তো দেখি কয়দিন পরপর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরী করার দৃশ্য। এছাড়া আমরা যেসকল খাবার রান্না করি তার মধ্যেও পাওয়া যায় ফরমালিন, বলুন ভালো খাচ্ছি কোথায়। এতকিছু ভাবলে তো না খেয়ে থাকতে হবে কেননা পানির মধ্যেও সমস্যা আছে শুনলাম বেশ কয়েক বছর আগে। সামনে গিয়ে আড্ডা জমালাম রিকশাওয়লাদের সঙ্গে তারা দলবেঁধে খাচ্ছে ঝালমুড়ি। শফিক নামে এক রিকশাচালক। বাসা ধোলাইখাল আর গ্যারেজ যাত্রাবাড়ি। প্রতিদিন উপার্জন করে ৬০০ টাকা তার মধ্যে রিকশার পিছনে চলে যায় ২০০ টাকা আর নিজের খাওয়ার জন্য রাখে তিনবেলায় ১০০ টাকা। যখনই বললাম এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার খান কেন মামা? তখনই হাসি দিয়ে বললো মামা আমগো কি এসির বাতাসে খাবার খাওয়ার ভাগ্য আছে। আসলেই তাই পথখাবার যারা খাচ্ছেন তাদের বিরাট একটা দরিদ্র জনগোষ্ঠী যারা জেনেই গ্রহণ করছে এসব খাবার। অনেকের সাথে কথা বলে যা বুঝলাম সখ করে ফুটপাথের বা ‘পথ-খাবার’ খেয়ে থাকেন ভোজনরসিক মানুষেরা। তেমনি বিপুল সংখ্যক মানুষকে নিতান্ত প্রয়োজনেই এই পথের খাবার খেতে হয়। চাকরিজীবী মানুষ বড় গলায়ই বললো আমাদের মধ্যাহ্নভোজের ভরসা এই পথ খাবার।
বিক্রেতাদের কথা
তালতলা মার্কেটের বিপরীত পাশে বেশ কয়েক বছর যাবত কাবাবের দোকান চালান আল আমিন। তিনি বলেন বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত কমপক্ষে দুইশো মানুষ কাবাব খান এই দোকানে। রীতিমতো দাঁড়িয়ে থাকতে হয় কাবাব খাওয়ার জন্য। তিনি জানায় আমাদের কাবাবের প্রাথমিক প্রক্রিয়া বাসার মধ্যেই তৈরী করা হয় আমরা যথেষ্ট পরিমাণে চেষ্টা করি স্বাস্থ্যকর খাবার দিতে আপনাদের। এছাড়া সকলের হাতে গ্লাভস পরার মাধ্যমে চেষ্টা করি জীবানু থেকে খানিকটা দূরে থাকতে। ছোট একটা বেসিনে সকলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে হাত ধোয়ার কাজটি সেরে খাবার মুখে দিচ্ছে দেখা গেলো। খানিকটা সামনে গিয়ে দেখলাম আনারস বিক্রি করছে করিম। হাতে একটা কালো রঙের গ্লাভস পরে কাটছে আনারস আর একটা বোতলের পানি দিয়ে ধুয়ে নিচ্ছে কাটা আনরস গুলো। জানতে চাইলাম পানিগুলো কোথাকার। জানালেন আমার বাসা থেকেই আনা। তিনি নিজে বললেন আমি খাই বাসায় সেটা দিয়েই সকলকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছি।
পথখাবার নিয়ে কিছু কথা
মানসম্মত তো? আমাদের সকলের উত্তর হবে না?
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের এক হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন ৬০ লাখের বেশি মানুষ ঢাকায় পথ খাবার খেয়ে থাকেন। পথখাবার কতখানি মানসম্মত তা নিয়ে আমাদের চিন্তা থাকলেও খাওয়ার সময় কোন মানা নেই। আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায় এসেছে, ফুটপাথের ৫৫ ভাগ খাবারেই জীবাণু রয়েছে। আর ৮৮ ভাগ বিক্রেতার হাতেই জীবাণু থাকে। পথখাবার যারা বিক্রি করে তাদের বসার কোনও নির্দিষ্ট জায়গা নেই বললেই চলে। ফুটপাথেই বসছে দোকানীরা ফলে ধুলোবালি, রোগ-জীবাণু সহজেই মিশে যাচ্ছে খাবারে। পাশাপাশি হাত পরিষ্কার না করেই তারা খাবার তৈরি করছেন। এই সমস্যা সমাধানে একটা পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা করা প্রয়োজন যেখানে পথখাবার বিক্রেতাদের একটা নেটওয়ার্ককের মধ্যে আনা যাবে। তাদের কে সরকারি বেসরকারি ভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে স্বাস্থ্যকর খাবার কতটা জরুরি সেই বিষয়ে। যখন বিক্রেতা নিজে বুঝতে সক্ষম হবে কি করা জরুরি। তখন এই সমস্যা সমাধান ঘটবে।
ছবি: আবু সুফিয়ান রতন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 × 3 =