নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গণসচেতনতা গড়ে তোলার আহ্বান, সামাজিক আন্দোলনের ওপর জোর তিতুমীরের

ঢাকা, ২ আগস্ট ২০২৬: নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারকে কেবল সরকারি উদ্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় পর্যায়ের সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেছেন, মানুষের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির চাহিদা ও সচেতনতা তৈরি করতে পারলে বাজারও সেই চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোবে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।

রোববার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি’ বিষয়ক এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. তিতুমীর বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করতে পরিবেশ, জলবায়ু, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের বিকল্প নেই। আর এ লক্ষ্য অর্জনে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কেন্দ্র করে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, “প্রথম কাজ হচ্ছে মানুষের মধ্যে চাহিদা সৃষ্টি করা। চাহিদা তৈরি হলে সরবরাহও সেই দিকেই এগোবে।” তাঁর মতে, গণসাক্ষরতা অভিযান, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি এবং খাল খনন কর্মসূচির মতো সফল উদ্যোগগুলো সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হওয়ার কারণেই কাঙ্ক্ষিত ফল এসেছে। একইভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে এনজিও, নাগরিক সমাজ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, গৃহস্থালি পর্যায়ে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো গেলে গ্যাস ও এলপিজির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এতে পরিবারের জ্বালানি ব্যয় হ্রাস পাবে, সঞ্চয় বাড়বে এবং দেশের আমদানি ব্যয়ও কমে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার হবে।

তিনি জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে স্থানীয় শিল্প বিকাশে সরকার সৌর প্যানেল, ব্যাটারি ও ইনভার্টার উৎপাদনে উৎসাহ দিচ্ছে। বিনিয়োগ বাড়াতে কর-প্রণোদনা ও নীতিগত সংস্কারের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমসহ সহজ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণেও কাজ চলছে।

ড. তিতুমীর বলেন, প্রতিটি এনজিও তাদের উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে। প্রয়োজন হলে এ খাতে আরও পুনঃঅর্থায়ন ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা চালুর বিষয়ও বিবেচনা করা হবে।

তিনি আরও বলেন, সরকার শুধু কর-সুবিধা দিয়ে নয়, দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চায়।

জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে ড. তিতুমীর বলেন, দীর্ঘদিন গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশকে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্বনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সময়ের দাবি।

তিনি জানান, সরকার ধাপে ধাপে দেশের এনার্জি মিক্সে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। গৃহস্থালি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন খাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

ড. তিতুমীর বলেন, সরকারের একার পক্ষে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক, পল্লী বিদ্যুৎ, এনজিও, বেসরকারি খাত এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। উপজেলা থেকে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত জনসচেতনতা সৃষ্টি করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারকে জাতীয় সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা গেলে বাংলাদেশ জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে।

কর্মশালায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালাসহ জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

twelve − 9 =