প্রথমবারের মতো ‘মূকাভিনয়ে নজরুল’ উৎসব

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশানের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক আয়োজন ‘মূকাভিনয়ে নজরুল’।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিকালে ঢাকার ধানমন্ডিতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মূকাভিনয়শিল্পীরা নীরব দেহভাষা, অভিব্যক্তি ও শৈল্পিক উপস্থাপনার মাধ্যমে নজরুলের প্রেম, দ্রোহ, সাম্য, মানবতা ও মুক্তির দর্শনকে তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকতে না পেরে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও উপস্থিতি না থাকতে পেরে শুভেচ্ছা বার্তা জানান সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা এবং বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশানের সভাপতি সোলেমান মেহেদী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মো. লতিফুল ইসলাম শিবলী।

দেশের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, কবি, সাহিত্যিক, মূকাভিনয়শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী ও বিপুলসংখ্যক দর্শকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও আবেগঘন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশানের সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম রুবেল। ‘নজরুলের সাহিত্যে মূকাভিনয় ভাবনা : তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রসঙ্গ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশানের কার্যনির্বাহী সদস্য ড. ইস্রাফিল আহমেদ রঙ্গন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ‘কাজী নজরুল ইসলাম কেবল বিদ্রোহের কবি নন; তিনি প্রেম, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা, মানবতা ও মানবমুক্তির চিরন্তন কণ্ঠস্বর। নতুন প্রজন্মের কাছে নজরুলের দর্শন ও সৃষ্টিকে সমকালীন ও সৃজনশীল শিল্পভাষায় পৌঁছে দিতে মূকাভিনয়ের মতো শক্তিশালী পারফর্মিং আর্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

নজরুলকে নিয়ে কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজনে একটি মূকাভিনয় পরিবেশনা কিংবা মূকাভিনয়ের কোনো আয়োজনে নজরুলের কোনো সৃষ্টি উপস্থাপনের নজির থাকলেও, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে কেন্দ্র করে পূর্ণাঙ্গ মূকাভিনয় উৎসব আয়োজনের উদ্যোগ বাংলাদেশে এই প্রথম বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশানের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন দলের বিশেষ মূকাভিনয় প্রযোজনা এতে পরিবেশিত হয়। অংশগ্রহণকারী দলগুলো হলো দ্য মামার্স, মূকবলাকা, মুক্তমঞ্চ নির্বাক দল, মাইম ফেইস, সাইলেন্ট থিয়েটার, প্যান্টোমাইম মুভমেন্ট, শাওন মাইম একাডেমি, রঙ্গন মাইম একাডেমি ও মুক্ত বিহঙ্গ।

নীরব দেহভাষা, শারীরিক অভিব্যক্তি, গতি, ছন্দ ও মঞ্চ-নান্দনিকতার মাধ্যমে শিল্পীরা নজরুলের চেতনার বিভিন্ন দিক দর্শকের সামনে তুলে ধরেন। শব্দহীন অথচ শক্তিশালী এই শিল্পভাষা দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে। পরিবেশনা শেষে শিল্পীরা দীর্ঘক্ষণ করতালিতে সিক্ত হন।

ভাবনা থেকে স্বপ্ন, স্বপ্ন থেকে আয়োজন

নজরুল বর্ষকে মূকাভিনয়ের মাধ্যমে কীভাবে বিশেষভাবে উদযাপন করা যায়, সেই ভাবনা থেকেই আয়োজনটির সূচনা। বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশানের অনুষ্ঠান সম্পাদক স্নিগ্ধা ফেরদাউসের প্রাথমিক ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সাংগঠনিক সম্পাদক শহিদুল মুরাদ, প্রশিক্ষণ সম্পাদক শাহরিয়ার শাওনসহ ফেডারেশানের সংশ্লিষ্টরা সম্মিলিতভাবে কাজ করেন।

আয়োজকদের ভাষায়, এটি শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং নজরুলচর্চায় মূকাভিনয়ের একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের প্রয়াস।

অনুষ্ঠানের আলোক পরিকল্পনা ও প্রক্ষেপণে ছিলেন মো. মোখলেছুর রহমান এবং আবহ সংগীতে ছিলেন নাজমুল । সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশানের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক তানজিম তাজওয়ার।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সমকালীন পারফর্মিং আর্টসের সমন্বয়ে নজরুলচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের লক্ষ্যেই এ আয়োজন। ভবিষ্যতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবস, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে আরও বৃহৎ পরিসরে এ ধরনের সৃজনশীল ও নান্দনিক আয়োজন অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তারা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

six − 1 =