বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য পোশাক আশাক

রিমন মাহফুজ : বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির জনক। খোকা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান। জীবনের নানা ধাপ পেরিয়ে তিনি একাধারে বিশ্বনেতা আর আইকন। স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকারের ব্যক্তিসত্তা বৈচিত্র্যময়, বর্ণাঢ্য। কেবল পোশাক-আশাকই নয়, বরং ব্যক্তিবৃত্তের পরিসীমার পরতে সংযোজিত গুণাবলি তাঁকে অনন্য স্টাইলিস্ট ব্যক্তিত্বে পরিণত করছিল।
একজন মানুষের উদ্বর্তনে, ব্যক্তিত্বের স্ফুরণে সম্পৃক্ত হয় নানা উপাদান। চলন-বলনের সঙ্গে পোশাকও তাঁর ব্যক্তিত্বে মাত্রা যোগ করে। শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য পেরিয়ে প্রৌঢ়ত্ব-সময়ের নানা বাঁক পেরোতে পেরোতে একেকজন মানুষ ব্যক্তিস্বরূপ ছাড়িয়ে আইকন হয়ে ওঠেন। পোশাক তখন কেবলই অনুষঙ্গ; বরং ব্যক্তিত্বের বিভায় তাঁর অবস্থান অন্যতর সোপানে। এমন বিরলপ্রজদের একজন অবশ্যই বঙ্গবন্ধু। তিনি যেটাই পরেছেন, সেটাতে হয়ে উঠেছেন অসাধারণ।
বঙ্গবন্ধুর পোশাক নিয়ে আলোচনায় তাঁর অসংখ্য ছবি বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয় নানা ধরনের পোশাক পরিধানের দৃষ্টান্ত। একেবারে আটপৌরে বাঙালি থেকে কেতাদুরস্ত রাষ্ট্রপ্রধান স্থান, কাল আর উপলক্ষবিশেষে বদলেছে তাঁর পোশাক। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর স্টাইলে ছিল দুটো সিগনেচার বিষয়ক ব্যাকব্রাশ করা চুল আর মোটা ফ্রেমের চশমা। এর সঙ্গে তিনি যেটাই পরেছেন, সেটাকে চমৎকারভাবে ক্যারি করায় প্রতীয়মান হয়েছে একজন স্টাইলিস্ট ব্যক্তির প্রতিকৃতি। সেই দৃশ্য হয়ে উঠেছে হৃদয়গ্রাহী, অনুসরণীয়।
অবশ্য দেশনেতা, বিশ্বনেতার বাইরে তিনি একজন সত্যিকারের গৃহী, পরিবারপ্রধান; তাঁর পোশাকে, বাৎসল্যে, আপনজনের সান্নিধ্য উপভোগে পরিতৃপ্তির প্রশান্তিতে সেটা বারবার ফুটে উঠেছে।
গণভবনে শেখ কামালের গায়েহলুদের পর সেদিনের সন্ধ্যায় ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ির ছাদে তোলা পাভেল রহমানের ছবিতে আমরা তাঁকে দেখি চেক লুঙ্গি আর স্যান্ডোগেঞ্জিতে। হাতে ধরা পাইপ মুখে ঠেকানো। চেয়ারের ওপর দুই পা ভাঁজ করে ফুলবাবু হয়ে একটু সামনে ঝুঁকে বসা। টেবিলের ওপর ছাইদানি। এই ছবি নিয়ে পাভেল রহমানের মনোগ্রাহী স্মৃতিচারণা আছে।
বাঙালি মধ্যবিত্তের পরিবারপ্রধানের এই আটপৌরে রূপ আমাদের সময় খুবই সাধারণ ছিল। লুঙ্গি আর গেঞ্জিতে বাঙালি সত্যিই স্বচ্ছন্দ। ফলে, বঙ্গবন্ধুকে নানা সময়ে দেখা গেছে তাঁর প্রিয় চেক লুঙ্গির সঙ্গে কখনো হাফহাতা শার্ট, কখনো পাঞ্জাবি বা কখনো স্রেফ স্যান্ডো গেঞ্জি বা হাফহাতা। বাসায় তিনি দুই ধরনের গেঞ্জিই পরতেন। একসময় এগুলোকে বলা হতো হোসিয়ারি।
খুব কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুকে দেখেছেন তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সাথি ও বন্ধু আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত মহিউদ্দিন আহমেদের বড় ছেলে আহমেদ সাজ্জাদুল আলম। তাঁর তোলা কিছু ছবিও আছে বঙ্গবন্ধুর। তিনিও লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরার কথা বলেছেন।
বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন ধরনের পোশাক পরেছেন। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্য পায়জামা-পাঞ্জাবি, স্যুট আর ম্যান্ডারিন কলার স্যুট। এ বিষয়ে কথা হয় সাংবাদিক এবং প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেস সেক্রেটারি তোয়াব খানের সঙ্গে। তিনি জানান, শীত ও গ্রীষ্মে আলাদা ধরনের কাপড়ের পাঞ্জাবি পরতেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর অফিশিয়াল ড্রেস ছিল ম্যান্ডারিন কলার স্যুট। ম্যান্ডারিন কলার কোটকে অনেকেই প্রিন্স কোট বলে ভুল করেছেন। কারণ, প্রিন্স কোট আজানুলম্বিত। কাট আর প্যাটার্নেও আছে ভিন্নতা। ম্যান্ডারিন কলারকে দণ্ডায়মান, ব্যান্ড বা চোকার কলারও বলে। এই কলার চওড়ায় নানা মাপের হয়ে থাকে। একই কাপড়ের প্যান্ট আর কোট। তবে ভেতরে শার্ট পরতেন। বঙ্গবন্ধু অবশ্য কোটের ওপরের বোতাম লাগাতেন না। এমনকি কেবল শার্ট বা পাঞ্জাবি পরলেও সেটা করতেন। এটাই ছিল তাঁর স্টাইল।
তোয়াব খান আরও জানান, তাঁর বেলগ্রেড আর অটোয়া যাওয়ার জন্য স্যুট বানানোর প্রয়োজন হলে সবাই তাঁকে পিজি (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) হাসপাতালের নিচে জেন্টালিয়া টেইলার্সে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এখান থেকেই বঙ্গবন্ধু সব ধরনের পোশাক বানাতেন।
তখন পাঞ্জাবি ছিল খাটো ঝুলের। আর পায়জামা ছিল অনেক ঘেরওয়ালা। গরমকালে তিনি আদ্দির আর অন্য সময় পুরু কিন্তু সুতির গোল গলার পাঞ্জাবি পরতেন। শীতকালে পাড়ে সুন্দর কাজ করা কাশ্মীরি শাল পরতেন। পায়জামা-পাঞ্জাবি আর ওয়েস্ট কোটের ওপর উত্তরীয়র ঢঙে শাল পরতেও দেখা গেছে। কখনো আবার পাঞ্জাবির ওপর জড়িয়েও চাদর পরতেন। তবে প্রথম জীবনে খাদি পরতে দেখা গেলেও পরে তিনি সুতিই পরেছেন বলে জানা গেছে। অন্য একটি সূত্র থেকে জানা যায়, তিনি যাবতীয় কাপড় কিনতেন রমনা ভবনের পাশে বর্তমানে ইম্পেরিয়াল হোটেল যেখানে, সেখানকার গ্যানিস নামে একটি দোকান থেকে। কালো ওয়েস্ট কোট পরার আগে তিনি পায়জামা-পাঞ্জাবির সঙ্গে কার্ডিগানও পরেছেন। কখনো বোতাম লাগিয়ে, কখনো না লাগিয়ে। বিষয়টিতে সহমত হয়েছেন আহমেদ সাজ্জাদুল আলমও।
ছয় ফুটের ওপর দীর্ঘ এই মানুষ তরুণ বয়সে ছিলেন ছিপছিপে গড়নের। তখন তিনি আর পাঁচটা বাঙালি যুবকের মতো শার্ট-প্যান্ট পরেছেন। তাঁর গোঁফ তখন ছিল চিকন। পরে তিনি কোট-প্যান্ট-টাইতে ছিলেন স্বচ্ছন্দ। বিভিন্ন ছবিতে তাঁর এই কেতাদুরস্ত চেহারা ফুটে ওঠে। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তাঁকে হাফ শার্ট আর প্যান্টে দেখা গেছে। আবার শেরেবাংলার সঙ্গে তাঁকে দেখি প্যান্ট আর হাতা গোটানো টাকড ইন শার্ট, মোজা ও পাম্প শুতে। পক্ষান্তরে, ১৯৪৭ সালে কলকাতায় মহাত্মা গান্ধী ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে দেখা যায় প্যান্ট আর শার্টের ওপর লংকোট পরিহিত। তাঁর নানা পোশাক প্রসঙ্গে এটির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন বিশিষ্ট গবেষক হাসান মোরশেদ।
এ ছাড়া ঢাকায় ১৯৫৬ সালে চৌ এন লাইয়ের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি পায়জামার সঙ্গে লম্বা ঝুলের ম্যান্ডারিন কলার কোট পরেছিলেন।
কোট-প্যান্ট-টাই বা স্যুট-টাই পরা বঙ্গবন্ধুকে আমরা দেখি নানা সময়ে, নানা অনুষ্ঠানে। ১৯৫৬ সালে শিল্পমন্ত্রী হিসেবে যেমন, তেমনি ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানে ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লির প্রথম দিনে বা চুয়ান্নয় মন্ত্রিসভার শপথের দিনে।
১৯৫৭ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের লিডারশিপ কর্মসূচিতে বোস্টনে যান। বোস্টন জেনারেল হসপিটালে তাঁর সার্জারিও হয়। হার্ভার্ডে অবস্থানকালে একটি ছবিতে তাঁকে দেখা যায় শহীদ মুনীর চৌধুরী ও মো. মতিউল ইসলামের সঙ্গে। কোট-প্যান্ট-টাই হাতে ওভারকোট। নানা ধরনের টুপিও পরতে দেখা গেছে বঙ্গবন্ধুকে। ১৯৫৬ সালে চীন সফরে মাও সেতুংয়ের সঙ্গে করমর্দনের সময় কারাকুল টুপি বা পার্সিয়ান (মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার পুরুষদের অনুষঙ্গ কারাকুল প্রজাতির ভেড়ার লোমে তৈরি এই টুপি) যেমন পরেছেন, তেমনি ১৯৭২ সালে সোভিয়েত সফরে পরেছেন পাপাখা বা আজারবাইজানি টুপি। সেবার মস্কোয় প্রধানমন্ত্রী আলেক্সেই কোসিগিনের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সালাম গ্রহণের সময় তাঁকে দেখা যায় শার্ট, ম্যান্ডারিন কলার স্যুট ওভারকোট আর ফারের পাপাখায়। গেটি ইমেজের এই ছবিতে বিশেষভাবে দৃশ্যমান তাঁর স্যালুট দেওয়ার ভঙ্গি। তিনি বুড়ো আঙুল ভাঁজ করে চার আঙুল দিয়ে সালাম দিতেন। আসলে এটা ভীষণই তাৎপর্যপূর্ণ। চার আঙুল মানে আমাদের চার মূল্যবোধ-ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ।
এই প্রসঙ্গে আহমেদ সাজ্জাদুল আলম আরও যোগ করেন, বঙ্গবন্ধু যে পাতলা কাপড়ের সাদা টুপি পরতেন, সেখানে কখনো কখনো চারটি তারা থাকত। আর এই তারা আদপে চার মূল্যবোধকেই সূচিত করে।
১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে ছয় দফা ঘোষণার সময় বঙ্গবন্ধুকে শার্টের ওপর চেকড ব্লেজার পরতে দেখি। সেখানেও শার্টের ওপরের বোতাম খোলা। আবার ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি লন্ডনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি উপস্থিত হন কোট বা ম্যান্ডারিন কলার স্যুটের সঙ্গে হাতে লাগানো কাফলিন লাগানো শার্টে।
বাহাত্তরে লন্ডনের ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে সাক্ষাৎ, বাকিংহাম রাজপ্রাসাদে রানি এলিজাবেথের সঙ্গে সাক্ষাৎ, তিয়াত্তরের জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন কিংবা পরের বছরের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগদানে তাঁর আনুষ্ঠানিক পোশাক ছিল ম্যান্ডারিন কলার স্যুট।
লন্ডনের ক্লারিজেজ হোটেলে বঙ্গবন্ধুকে পায়জামা-পাঞ্জাবির ওপর নাইট গাউনে দেখা যায়। উজ্জ্বল কাপড়ের ওপর সরলরেখায় পোলকা ডট প্রিন্টের এই নাইট গাউন সিল্ক বা স্যাটিনের হতে পারে।
লন্ডন প্রসঙ্গে একটু উল্লেখ প্রয়োজন, স্যুট তৈরির জন্য ভুবনখ্যাত সেভিল রোর কোনো একটি টেইলারিং শপ থেকে পোশাক বানিয়ে নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তবে দোকানটির নাম জানা সম্ভব হয়নি। বর্ষীয়ান সাংবাদিক তোয়াব খানও মনে করতে পারেন নি সেই টেইলারিং হাউসের নাম।
এবার আসা যাক বঙ্গবন্ধুর কালো ওয়েস্টকোট প্রসঙ্গে। যেটা মুজিব কোট হিসেবেই সুবিদিত। কবে বা কখন থেকে তিনি এটা পরতে শুরু করেন, তা নিয়ে নানা মত রয়েছে। ড. কামাল হোসেনের উদ্ধৃতি দিয়ে একটা সূত্র জানাচ্ছে, ১৯৬৮ সাল থেকে তিনি এই কোট নিয়মিত পরেছেন। জিন্নাহ কোট বা জওহর কোটের সঙ্গে এই ওয়েস্টকোটের দৃশ্যমান পার্থক্য বিদ্যমান। কারণ জওহর কোট আদপে যোধপুরির একটি ধরন। যেটার উৎপত্তি আংরাখা থেকে। এই কোট হাঁটু পর্যন্ত লম্বা। আর ম্যান্ডারিন কলার দেয়া।
অন্যদিকে ছয় বোতামের এই কোট কালো এবং সিøভলেস, ম্যান্ডারিন কলারের। নিচে দুটো পকেট। আর সাইড-সিøট। তবে ছয় বোতামের ধারণা ছয় দফা দাবি থেকে এসেছে, এমন বলা হলেও একাধিক ব্যক্তি এই বিষয়ের যথার্থতা খুঁজে পান না। একটি সূত্র থেকে জানা যায়, এই কোটের ডিজাইন একজন দর্জির করা। যিনি বঙ্গবন্ধুর পোশাক বানাতেন।
নানা পোশাকে তাঁকে আমরা দেখি। স্থান, কাল, পাত্র ভেদে তিনি পোশাক নির্বাচন করেছেন। সেখানে তাঁর সচেতন পছন্দ এবং পরিবেশের গুরুত্ব প্রাধান্য পেয়েছে। আবার তিনি বাড়িতে, স্ত্রী সন্তানদের সঙ্গে একেবারেই অন্য মানুষ হয়ে উঠতেন। তাঁর পোশাকও তখন তেমনই হতো। মোটা ফ্রেমের কালো চশমা, ব্যাকব্রাশ করা চুল আর হাতে ধরা পাইপের সিগনেচার স্টাইল, সঙ্গে তাঁর উপলক্ষ্য ভেদে পোশাকের রকমফেরে এক ট্রেন্ডি ও স্টাইলিশ ব্যক্তিত্বের নানা অবয়বই দৃষ্টিগোচর হয়।
সূত্র : উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

14 − six =