বিশ্লেষণ – মেরিনোর শেষ মুহূর্তের নৈপুণ্যে স্পেনের সেমিফাইনাল, এবার মহারণ ফ্রান্সের বিপক্ষে

লস অ্যাঞ্জেলেসের হলিউড নগরীতে বিশ্বকাপের আরেকটি রুদ্ধশ্বাস কোয়ার্টার ফাইনালে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে স্পেন। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক মিনিট আগে বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনোর জয়সূচক গোলে ২-১ ব্যবধানে বেলজিয়ামকে হারিয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। এবার তাদের সামনে অপেক্ষা করছে টুর্নামেন্টের আরেক শক্তিশালী দল ফ্রান্স।

এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বেলজিয়ামের দীর্ঘদিনের ‘সোনালি প্রজন্মের’ বিশ্বকাপ স্বপ্নেরও কার্যত অবসান ঘটল। অন্যদিকে স্পেন আরও একবার প্রমাণ করল, তারা শুধু বল দখলের ফুটবলই খেলে না, প্রয়োজনের মুহূর্তে ম্যাচ জয়ের উপায়ও খুঁজে নিতে জানে।

শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল স্পেনের হাতে। দ্রুত পাস, দারুণ বল নিয়ন্ত্রণ এবং ধারাবাহিক আক্রমণে বেলজিয়ামের রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রাখে তারা। তবে স্প্যানিশ আক্রমণের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া। একের পর এক দুর্দান্ত সেভে তিনি দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন।

অবশেষে ৩০তম মিনিটে সেই প্রতিরোধ ভাঙে। দানি অলমোর প্রথম প্রচেষ্টা কোর্তোয়া ফিরিয়ে দিলেও ফিরতি বলে ফাবিয়ান রুইস গোল করে স্পেনকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন।

গোল হজমের পরও বেলজিয়াম ভেঙে পড়েনি। বরং দ্রুত পাল্টা আক্রমণে স্পেনের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। প্রথমার্ধের শেষ দিকে টিমোথি কাস্তানিয়ের নিখুঁত ক্রস থেকে চার্লস ডি কেটেলারের শক্তিশালী হেড স্পেনের জালে জড়িয়ে যায়। বিশ্বকাপে টানা ৬০০ মিনিটের বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো গোল হজম করে স্পেন এবং ম্যাচে ফিরে আসে বেলজিয়াম (১-১)।

দ্বিতীয়ার্ধে স্পেন আবারও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তারা একের পর এক আক্রমণ চালালেও কোর্তোয়া ছিলেন দুর্ভেদ্য। কিন্তু ৭২তম মিনিটে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন বেলজিয়ামের এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক। আবেগাপ্লুত কোর্তোয়াকে মাঠ ছাড়তে দেখা যায় চোখের জল নিয়ে। তার পরিবর্তে নামেন তরুণ গোলরক্ষক সেনে ল্যামেন্স।

কোর্তোয়ার বিদায়ের পর স্পেনের আক্রমণের চাপ আরও বাড়ে। ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছে, তখনই আসে সিদ্ধান্তসূচক মুহূর্ত। ৮৬তম মিনিটে পাও কুবারসির দূরপাল্লার শট ল্যামেন্স পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে ব্যর্থ হলে ফিরতি বলে বাজপাখির মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে জালে বল জড়িয়ে দেন বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনো। পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোলের পর এবারও স্পেনের ত্রাতা হয়ে ওঠেন তিনি।

পরিসংখ্যানও স্পেনের শ্রেষ্ঠত্বেরই সাক্ষ্য দেয়। বল দখল, আক্রমণ তৈরি এবং গোলের সুযোগ সৃষ্টিতে তারা ছিল অনেক এগিয়ে। তবে বেলজিয়ামও দেখিয়েছে অসাধারণ লড়াইয়ের মানসিকতা। বিশেষ করে পাল্টা আক্রমণে তারা স্পেনের রক্ষণকে একাধিকবার চাপে ফেলেছে এবং টুর্নামেন্টে প্রথমবারের মতো স্পেনের রক্ষণভাগ ভাঙার কৃতিত্বও তাদের।

এখন স্পেনের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ফ্রান্স। কিলিয়ান এমবাপে, উসমান দেম্বেলের মতো গতিময় ও বিধ্বংসী আক্রমণভাগকে সামলাতে হলে স্পেনকে আরও নিখুঁত ও কৌশলী ফুটবল খেলতে হবে। শুধু বল দখলে রাখলেই চলবে না, রক্ষণেও থাকতে হবে অনেক বেশি সতর্ক।

তবে স্পেনের আত্মবিশ্বাসের কারণও কম নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপের অন্যতম সফল দল হিসেবে তারা ফ্রান্সকে হারানোর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ফলে আসন্ন সেমিফাইনালটি হতে যাচ্ছে দুই আধুনিক ফুটবল শক্তির কৌশল, গতি ও দক্ষতার এক আকর্ষণীয় লড়াই, যেখানে সামান্য ভুলই নির্ধারণ করে দিতে পারে ফাইনালের টিকিট।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

18 − eleven =