বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় নির্ধারণে একমত হতে পারেনি জাতিসংঘ জলবায়ু প্যানেল

বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ে পরবর্তী প্রতিবেদন প্রকাশের সময়সীমা নির্ধারণে এক সপ্তাহের দীর্ঘ ও কঠিন আলোচনা শেষে ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি)। শুক্রবার আলোচনায় ফ্রান্সের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি বেনোয়া ফারাকো এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ইউরোপের অনেক দেশ ২০২৮ সালে আইপিসিসির পরবর্তী প্রতিবেদন প্রকাশের পক্ষে থাকলেও ‘কয়েকটি দেশ’ তা পিছিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছে।

প্যারিস থেকে এএফপি জানায়, লিংকডইনে দেওয়া এক পোস্টে ফারাকো বলেন, ‘এক সপ্তাহের কঠিন আলোচনার পর পাঁচটি মহাদেশের উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি বিস্তৃত জোট বিজ্ঞানের প্রতি সমর্থন এবং বিজ্ঞানীদের প্রস্তাবিত সময়সীমা বজায় রাখার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ ছিল। প্রতিবেদন গ্রহণের প্রক্রিয়া ধীর করার চেষ্টা করা কয়েকটি দেশের চাপ তারা মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এই অচলাবস্থা নতুন নয়। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আমাদের পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে এটি মূল্যবান সময় নষ্ট করার ঝুঁকি তৈরি করছে।’

জলবায়ুবিজ্ঞানের বৈশ্বিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে পরিচিত আইপিসিসির পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনটি ২০২৮ সালে প্রকাশের পক্ষে ছিল অনেক দেশ। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর অগ্রগতি পর্যালোচনায় প্রতিবেদনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তারা মনে করে।

তবে সৌদি আরব, ভারত ও চীনসহ কয়েকটি দেশ বলেছে, আইপিসিসির সপ্তম মূল্যায়ন প্রতিবেদন ২০২৯ সালে প্রকাশ করা হলে উন্নয়নশীল দেশগুলো এর ফলাফল পর্যালোচনা ও নিজেদের পরিকল্পনায় তা কাজে লাগানোর জন্য আরও সময় পাবে।

সোমবার আদ্দিস আবাবায় আইপিসিসির বৈঠক শুরু হলে সংস্থাটির চেয়ারম্যান জিম স্কিয়া দেশগুলোকে অচলাবস্থা নিরসনের আহ্বান জানান। এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের ‘প্রাতিষ্ঠানিক ও সুনামগত গুরুত্ব’ রয়েছে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

এর আগে গত সপ্তাহে ৩০টিরও বেশি দেশের মন্ত্রীরা একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেন। এতে ‘গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর সঙ্গে যাদের দীর্ঘদিনের স্বার্থের সংঘাত রয়েছে’, তাদের সমালোচনা করা হয়।

চিঠিতে বলা হয়, ‘জাতিসংঘের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়াকে আইপিসিসির সরবরাহ করা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক প্রচেষ্টা দুর্বল হবে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

চিঠিতে স্বাক্ষরকারী ৩৫টি দেশের প্রায় অর্ধেক ছিল ইউরোপীয় ও অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশ। তবে বিশ্বের ৪৪টি দরিদ্রতম দেশের প্রতিনিধিত্বকারী স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) গোষ্ঠীর চেয়ারম্যানও এতে স্বাক্ষর করেন। ছোট দ্বীপরাষ্ট্র এবং অনেক উদীয়মান অর্থনীতির দেশের মন্ত্রীরাও চিঠিতে স্বাক্ষর করেন।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে ভয়াবহ ক্ষতির আশঙ্কায় থাকা মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের জলবায়ুবিষয়ক দূত টিনা স্টেগ বলেন, ‘কয়েকটি দেশ বারবার আইপিসিসির প্রতিবেদন প্রকাশে বিলম্ব ঘটাচ্ছে—এটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। অথচ নিজেদের দেশে মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় আমাদের এই বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘আমরা কাজ করতে এসেছিলাম, কিন্তু অন্তর্ভুক্তি, জাতীয় পরিকল্পনায় বিজ্ঞানের প্রাসঙ্গিকতা এবং পরবর্তী বৈশ্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনায় বৈজ্ঞানিক প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে উত্থাপিত প্রতিটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অগ্রগতি আটকে রাখা হয়েছে। সময় নষ্ট করার কোনো অবকাশ না থাকলেও এটি সময়ক্ষেপণের লজ্জাজনক চেষ্টা।’

জলবায়ু অ্যাকশন নেটওয়ার্কের শ্রীশান ভেঙ্কটেশ এ ব্যর্থতায় গভীর হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর জন্য পক্ষগুলোর হাতে যথেষ্ট সময় ছিল।’

তিনি যত দ্রুত সম্ভব আইপিসিসির আলোচনা পুনরায় আয়োজনের আহ্বান জানান।

ভেঙ্কটেশ বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব অধিবেশন পুনরায় আয়োজন করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, বিশ্ব প্রতিদিনই ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব প্রত্যক্ষ করছে। বিশেষ করে যেসব মানুষ ও জনগোষ্ঠী এই সংকট সৃষ্টির জন্য সবচেয়ে কম দায়ী, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে।’

আইপিসিসির প্রতিবেদন সাধারণত প্রতি পাঁচ থেকে সাত বছর পর প্রকাশিত হয়। সংস্থাটির ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল ২০২১ সালে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

one × three =