জলবায়ু হুমকি বাড়তে থাকায় কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে কপ৩১ সম্মেলন

জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী সোমবার তুরস্কে শুরু হচ্ছে জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক সম্মেলন কপ৩১। এএফপি

তবে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জলবায়ু তহবিল এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানোর প্রশ্নে মতবিরোধের কারণে সম্মেলন থেকে বড় কোনো অগ্রগতির প্রত্যাশা কম।

ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় শহর আনতালিয়ায় জাতিসংঘের দুই সপ্তাহব্যাপী এই জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি এক লাখের বেশি মানুষের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে, আর্থিক সংকটে থাকা উন্নত দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আরও বেশি অর্থ দিতে আগ্রহী নয়।

এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপও সম্মেলনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

জলবায়ু সম্মেলনে ফ্রান্সের সাবেক প্রধান আলোচক পল ওয়াটকিনসন বলেন, ‘এবারের সম্মেলন বিশ্বকে বদলে দেওয়ার মতো কোনো সম্মেলন হতে যাচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক দিক থেকেই এটি একটি মধ্যবর্তী পর্যায়ের সম্মেলন। তবে সম্মেলনটি গুরুত্বপূর্ণ এবং এখানে অগ্রগতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’

নেপালে ভয়াবহ বন্যা, ইউরোপে তীব্র তাপপ্রবাহ ও ইন্দোনেশিয়ায় বড় ধরনের দাবানলের পর এবারের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

এদিকে, চলতি বছরের শেষ দিকে এল নিনো নামের একটি শক্তিশালী জলবায়ু পরিস্থিতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর ফলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ২০২৬ বা ২০২৭ সাল বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

জলবায়ু পরিস্থিতির পূর্বাভাস ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সতর্ক করে জানায়, শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে।

প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির যে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল, এটি তার চেয়েও বেশি।

বাস্তবায়নই এবারের সম্মেলনের মূল লক্ষ্য

এবারের কপ৩১ সম্মেলনের সভাপতিত্ব করছে তুরস্ক। তবে একটি বিশেষ সমঝোতার আওতায় সম্মেলনের আলোচনা প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছে অস্ট্রেলিয়া।

সম্মেলনটি কোথায় অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে বিরোধের অবসান ঘটাতেই এই ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রী ক্রিস বোয়েন বলেন, ‘বিশ্বের জন্য অত্যন্ত কঠিন এক সময়ে কপ৩১ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রায় ২০০টি দেশের মধ্যে ঐকমত্যে পৌঁছানো সহজ হবে না। তবে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই।’

কপ৩১-এর সভাপতি ও তুরস্কের পরিবেশমন্ত্রী মুরাত কুরুম বলেন, অতীতের জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে নেওয়া অঙ্গীকারগুলোকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করবে এবারের সম্মেলন।

আনুষ্ঠানিক আলোচনার পাশাপাশি তুরস্ক একটি ‘অ্যাকশন এজেন্ডা’ বা কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরছে। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে শুরু করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে দেশগুলোকে স্বেচ্ছামূলক অঙ্গীকার গ্রহণে উৎসাহিত করা হবে। এসব অঙ্গীকার বাধ্যতামূলক নয়।

এই কর্মপরিকল্পনার অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হলো বিদ্যুতায়ন বাড়ানো। বর্তমানে বিশ্বের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ বিদ্যুতের মাধ্যমে পূরণ হয়। ২০৩৫ সালের মধ্যে এ হার বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশে উন্নীত করতে চায় তুরস্ক।

মুরাত কুরুম বলেন, ‘এ বছরের জ্বালানি সংকট আমাদের আত্মতুষ্টি থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করেছে। বিদ্যুতায়নই এর সমাধান। এটি বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা থেকে জনগণকে সুরক্ষা দেবে ও কার্বন নিঃসরণ কমাবে।’

তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়া চায় বিদ্যুতায়ন বাড়ানোর বিষয়টি সম্মেলনের চূড়ান্ত রাজনৈতিক ঘোষণাপত্রেও অন্তর্ভুক্ত হোক।

এ ঘোষণাপত্রটি সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয় এবং এতে সম্মেলনের প্রধান সিদ্ধান্তগুলো তুলে ধরা হয়।

তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ‘পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতায়ন’-এর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এ বিষয়টি তুরস্কের প্রস্তাবে জীবাশ্ম জ্বালানির ভূমিকা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে।

জলবায়ু কূটনীতি নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ই৩জি-এর বিশেষজ্ঞ কসিমা ক্যাসেল বলেন, ‘তুরস্কের কপ৩১ সভাপতিত্বের পক্ষ থেকে বিদ্যুতায়ন নিয়ে যে অঙ্গীকারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তার ভাষা বেশ সতর্কতার সঙ্গে নির্ধারণ করা হয়েছে।’

তিনি মনে করেন, প্রস্তাবটি বেশ উন্মুক্তভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে অনেক দেশই এতে যুক্ত হতে পারবে। কারণ, এতে বিভিন্ন ধরনের ও টেকসই জ্বালানির উৎস ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে বিরোধ

২০২৩ সালে কপ২৮ সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার বিষয়ে একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল দেশগুলো। তবে সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে এখনো মতৈক্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

গত বছরের কপ৩০ সম্মেলনেও জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট উল্লেখ ছাড়াই চুক্তি হয়। তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর আপত্তির কারণে চূড়ান্ত চুক্তিতে এ বিষয়ে স্পষ্ট ভাষা রাখা সম্ভব হয়নি।

এর পরিবর্তে ব্রাজিল একটি স্বেচ্ছামূলক রূপরেখা তৈরি করে। এতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার বিভিন্ন প্রস্তাব রাখা হয়। প্রতিটি দেশ নিজেদের পরিস্থিতি অনুযায়ী এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, গত বছরের সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল, কপ৩১-এ তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়া তার পুনরাবৃত্তি এড়াতে চায়।

তবে উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুত জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে নতুন বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অর্থ সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি ধনী দেশগুলো।

আফ্রিকার দেশগুলোর আলোচকরা দাবি জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় অভিযোজন খাতে অর্থায়ন তিন গুণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি এবারের সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অবকাঠামো, কৃষি, পানি ও অন্যান্য খাতকে প্রস্তুত করার জন্য যে অর্থ ব্যয় করা হয়, তাকে অভিযোজন অর্থায়ন বলা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও বিশ্বনেতাদের অংশগ্রহণ

সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল জলবায়ু আন্দোলনকর্মীদের নতুন করে আশাবাদী করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে চাপে পড়েছেন।

ট্রাম্প অবশ্য বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে বরাবরই ‘ভাঁওতাবাজি’ বলে দাবি করে আসছেন।

কপ৩১ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেবে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক আলোচনায় অংশ নিচ্ছে না।

অন্যদিকে, ব্রাজিলের রক্ষণশীল প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর দেশটির প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা আগামী সপ্তাহে আনতালিয়া সফর করবেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

four × 1 =