হৃদয়ের মহাকাব্যিক ইনিংস, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ঘুরে দাঁড়ানো

সালেক সুফী

টেস্ট ম্যাচ কিংবা সিরিজের শেষ পরিণতি যা-ই হোক, ৭ নভেম্বর ২০২৬ বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে গৌরব ও গর্বের দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম সেদিন প্রত্যক্ষ করেছে তাওহীদ হৃদয়ের এক মহাকাব্যিক ইনিংস—২২টি চার ও ১১টি ছক্কায় সাজানো ৩৫৯ বলে ২৪২ রানে অপরাজিত থাকা এক অনন্য ব্যাটিং-অধ্যায়। তাঁর অসাধারণ ব্যাটিংয়ে ১৮৪ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত প্রথম ইনিংসে ৩০ রানের লিড নিয়ে ৩৮৬ রান সংগ্রহ করেছে। তৃতীয় দিন শেষে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণও অনেকটাই বাংলাদেশের হাতে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসের ৩৫৬ রানের জবাবে একপর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। ১৮৪ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে ইনিংস শেষ হওয়ার শঙ্কায় পড়েছিল স্বাগতিকরা। তার ওপর চোটের কারণে সাদমান ইসলাম ব্যাট করতে না পারায় বাংলাদেশ কার্যত একজন ব্যাটার কম নিয়ে খেলছিল। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে দলের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠেন মাত্র তৃতীয় টেস্ট খেলতে নামা তাওহীদ হৃদয়।

ঢাকা টেস্টে দুই ইনিংসে দায়িত্বহীন ব্যাটিংয়ের কারণে সমর্থকদের সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন এই মারকুটে ব্যাটসম্যান। কিন্তু সিলেটে সেই হৃদয়ই নিজেকে নতুন করে চিনিয়েছেন। তাইজুল ইসলাম ও তাসকিন আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের আগ্রাসী বোলিংয়ের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন। একের পর এক ব্যক্তিগত ও দলীয় মাইলফলক গড়েছেন। নিজের প্রথম টেস্ট শতরানকে রূপ দিয়েছেন দ্বিশতকে। একই সঙ্গে মুশফিকুর রহিমের ২১৯ রানের রেকর্ড ছাড়িয়ে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের মালিক হয়েছেন। তাঁর ১১টি ছক্কাও বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ।

তৃতীয় দিন সকালে ৮৮/৩ রান নিয়ে ব্যাটিং শুরু করেছিল বাংলাদেশ। ক্রিজে ছিলেন হৃদয় ও মুশফিকুর রহিম। কিন্তু দিনের শুরু থেকেই উইকেটের সন্ধানে আক্রমণাত্মক বোলিং চালিয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। জোমেল ওয়ারিকান ও রস্টন চেজের স্পিনে দ্রুত ফিরে যান মুশফিক (৩৪), লিটন দাস (৮), মেহেদী হাসান মিরাজ (১৬) ও হাসান মাহমুদ (১)। একপর্যায়ে ১৮৪ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে চরম চাপে পড়ে বাংলাদেশ। তখনও ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ থেকে ১৭২ রান পিছিয়ে স্বাগতিকরা। এমন অবস্থায় বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর আশা খুব কম সমর্থকই করেছিলেন।

কিন্তু অন্য প্রান্তে অবিচল ছিলেন হৃদয়। তাঁকে দারুণভাবে সঙ্গ দেন তাইজুল ইসলাম। ৫৬ বল মোকাবিলা করে ২২ রান করা তাইজুল শুধু উইকেটে টিকে থাকেননি, অষ্টম উইকেটে ১১৭ রানের মূল্যবান জুটি গড়তেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামলে তাঁর এই অবদান টপ অর্ডারের ব্যাটসম্যানদের জন্যও শিক্ষণীয়।

তাইজুলের বিদায়ের পর শেষ ব্যাটসম্যান তাসকিন আহমেদকে নিয়ে নবম উইকেটে আরও ৮৫ রান যোগ করেন হৃদয়। তাসকিনের ১২ রান হয়তো ব্যক্তিগত হিসাবে বড় কিছু নয়, কিন্তু চাপের মুখে তাঁর প্রতিরোধ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে হৃদয় একের পর এক দৃষ্টিনন্দন স্ট্রোক খেলেছেন। ৫০ থেকে ১০০, ১০০ থেকে ১৫০, এরপর ২০০—প্রতিটি মাইলফলক অতিক্রম করেছেন অসাধারণ ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাসে।

প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্রতা উপেক্ষা করে ৩৫৯ বল খেলে ২৪২ রানে অপরাজিত থাকা শুধু রানের হিসাবেই অসাধারণ নয়; ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। শেষ দুই উইকেটে বাংলাদেশের সংগ্রহে এসেছে ২০২ রান। হৃদয়ের একক অবদানেই বদলে গেছে ম্যাচের চিত্র। একসময় যে দল বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কায় ছিল, তারাই শেষ পর্যন্ত ৩০ রানের লিড নিয়ে মাঠ ছেড়েছে।

আলোকস্বল্পতার কারণে টানা তৃতীয় দিনের মতো নির্ধারিত সময়ের আগেই খেলা শেষ হয়। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৪ ওভারে বিনা উইকেটে ৭ রান সংগ্রহ করেছে। ফলে ১০ উইকেট হাতে নিয়ে তারা এখনও বাংলাদেশের চেয়ে ২৩ রানে পিছিয়ে।

এখন বাংলাদেশের লক্ষ্য হবে দ্রুত ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় ইনিংসের উইকেট তুলে নিয়ে প্রতিপক্ষকে সীমিত রানের মধ্যে আটকে রাখা। নতুন বলে তাসকিন আহমেদ ও হাসান মাহমুদের ওপর থাকবে বড় দায়িত্ব। পাশাপাশি তাইজুল ইসলাম, মেহেদী হাসান মিরাজ ও নাঈম হাসানের স্পিন আক্রমণকেও কার্যকর হতে হবে। প্রয়োজন হবে দুর্দান্ত ফিল্ডিং এবং প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগানোর মানসিকতা।

টেস্ট জিতে সিরিজে সমতা ফেরানোর সুযোগ এখন বাংলাদেশের সামনে। দক্ষিণ আফ্রিকার কঠিন সফরের আগে এমন একটি জয় দলকে বড় আত্মবিশ্বাস জোগাতে পারে। তবে টেস্ট ক্রিকেটে শেষ কথা বলে না কোনো পূর্বানুমান। সিলেটের নয়নাভিরাম স্টেডিয়ামে এখনও তিনটি ফলের সম্ভাবনাই খোলা।

অনেকের ভিন্নমত থাকতে পারে। তবে পরিবেশ, প্রতিপক্ষের বোলিং, ম্যাচের পরিস্থিতি এবং দলের বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার বিবেচনায় তাওহীদ হৃদয়ের ২৪২ রানের ইনিংসকে আমি বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম সেরা—এমনকি সেরা ইনিংস হিসেবেও বিবেচনা করি। প্রার্থনা করি, এই ইনিংস হৃদয়কে ভবিষ্যতে আরও ধারাবাহিক ও দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে অনুপ্রাণিত করবে। সিলেটের এই অসাধারণ ইনিংস নাটকীয়ভাবে তাঁকে সমালোচনার মুখে থাকা খেলোয়াড় থেকে জাতীয় বীরের মর্যাদায় উন্নীত করেছে।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম ইনিংস: ৩৫৬ অলআউট (আমির জাঙ্গু ১৩৩, কেভিন উইকহাম ৬১, জাস্টিন গ্রিভস ৫১; হাসান মাহমুদ ৬/৯০, মেহেদী হাসান মিরাজ ২/৮২, তাসকিন আহমেদ ২/৯০)।

বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস: ৩৮৬ (১১১.৫ ওভার; তাওহীদ হৃদয় ২৪২*, মুশফিকুর রহিম ৩৪, তাইজুল ইসলাম ২২; জোমেল ওয়ারিকান ৪/১০৪, জেইডন সিলস ২/৫৮)। সাদমান ইসলাম চোটের কারণে ব্যাট করতে পারেননি।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বিতীয় ইনিংস: ৭/০ (৪ ওভার)।

লিড: ওয়েস্ট ইন্ডিজ এখনও ২৩ রানে পিছিয়ে।

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

sixteen − three =