ভাঙা আত্মবিশ্বাস নিয়েই অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট লড়াইয়ে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য ডারউইনের প্রস্তুতি ম্যাচটি যেন পুরোনো কিছু দুঃস্বপ্নকে আবার সামনে নিয়ে এলো। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচে ইনিংস ও ৩৮ রানের পরাজয় শুধু একটি ম্যাচ হারার ঘটনা নয়; অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আসন্ন টেস্ট সিরিজের আগে বাংলাদেশের ব্যাটিং সামর্থ্য নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

প্রথম ইনিংসে মেহেদী হাসান মিরাজের ১০৯ রানের অপরাজিত ইনিংস বাংলাদেশকে ২৬৩ রানের মোটামুটি সম্মানজনক সংগ্রহ এনে দিয়েছিল। এরপর হাসান মাহমুদ ও তাসকিন আহমেদের বোলিংয়ে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশ ৫ উইকেটে ১৩৯ রানে চাপে পড়েছিল। কিন্তু টিগ উইলির ১৩০, জ্যাক ডোরানের ৭৬ এবং কার্টিস প্যাটারসনের ৫৩ রানের ইনিংসে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি বদলে যায়। অস্ট্রেলিয়া একাদশ ৩৫৫ রানে অলআউট হয়ে ৯২ রানের লিড নেয়।

এরপর বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসের ব্যাটিং ছিল আরও হতাশাজনক। মাত্র ২২ ওভারে ৫৪ রানে গুটিয়ে যায় পুরো দল। ক্যাম্পবেল থম্পসন একাই ২৫ রানে ৮ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিংকে ধসিয়ে দেন।

প্রশ্ন উঠতেই পারে—অস্ট্রেলিয়ার মূল দলের বিপক্ষে খেলা নয়, এটি ছিল প্রস্তুতি ম্যাচ। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রস্তুতি ম্যাচেই যদি এমন ভঙ্গুর ব্যাটিং দেখা যায়, তাহলে স্টার্ক, হ্যাজেলউড, কামিন্স ও লায়নের মতো বিশ্বমানের বোলারদের সামনে বাংলাদেশ কীভাবে দাঁড়াবে?

বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট লড়াইয়ের ইতিহাসও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। ২০০৩ সালে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলেছিল বাংলাদেশ। ডারউইনের প্রথম টেস্টে অস্ট্রেলিয়া ইনিংস ও ১৩২ রানে এবং কেয়ার্নসের দ্বিতীয় টেস্টে ইনিংস ও ৯৮ রানে জয় পায়। দুই ম্যাচের সিরিজে বাংলাদেশের ব্যাটিং বারবার অস্ট্রেলিয়ার বোলিংয়ের সামনে ভেঙে পড়েছিল।

তবে ২০০৩ সালের বাংলাদেশের সঙ্গে আজকের বাংলাদেশকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। দুই দশকেরও বেশি সময়ে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের অনেক পথচলা হয়েছে। এই সময়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ ঘরের মাঠে স্মরণীয় জয় পেয়েছে। ২০১৭ সালে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো সেই সাফল্য এখনো বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম বড় অর্জন।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেও বাংলাদেশের কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত রয়েছে। ২০০৫ সালে কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মোহাম্মদ আশরাফুলের দুর্দান্ত শতরানের নেতৃত্বে পাওয়া জয় কিংবা পরবর্তী সময়ে সাদা বলের ক্রিকেটে বাংলাদেশের বিভিন্ন সাফল্য প্রমাণ করে, অসম লড়াইয়েও ক্রিকেটে অঘটন সম্ভব।

কিন্তু টেস্ট ক্রিকেট সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা। এখানে ধৈর্য, টেকনিক, কন্ডিশন বোঝার ক্ষমতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে চাপ সামলে থাকার দক্ষতাই মূল। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঘাসযুক্ত উইকেট, বাউন্স ও গতি বাংলাদেশের ব্যাটারদের জন্য কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।

তবু স্বপ্ন দেখা বন্ধ করার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া। প্রস্তুতি ম্যাচের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে টেস্টে নতুনভাবে শুরু করতে হবে।

শান্ত, মোমিনুল, মুশফিক ও লিটনের মতো অভিজ্ঞ ব্যাটারদের সামনে বড় দায়িত্ব। প্রথম ইনিংসে ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেলে অন্তত ৩০০ রানের কাছাকাছি যেতে পারলে ম্যাচের লড়াইয়ে থাকার সম্ভাবনা তৈরি হবে। বোলারদেরও প্রথম ইনিংসের মতো শুরু এনে দিয়ে চাপ ধরে রাখতে হবে।

অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণ যে কোনো ব্যাটিং লাইনআপের জন্য কঠিন পরীক্ষা। তাই বাংলাদেশের ব্যাটারদের শুধু প্রতিরোধ নয়, পরিস্থিতি অনুযায়ী পাল্টা আক্রমণের সাহসও দেখাতে হবে।

হারানোর অনেক কিছু থাকলেও অর্জনের সুযোগও কম নয়। প্রস্তুতি ম্যাচের ভয়াবহ ব্যর্থতার পর যদি বাংলাদেশ টেস্টে নিজেদের সামর্থ্যের কাছাকাছি ক্রিকেট খেলতে পারে, সেটিই হবে বড় প্রত্যাবর্তন।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ একপেশে হবে—এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। কিন্তু ক্রিকেটের সৌন্দর্যই হলো অনিশ্চয়তা। তাই ভাঙা আত্মবিশ্বাস নিয়েও বাংলাদেশের কাছে প্রত্যাশা একটাই—লড়াই করুক টাইগাররা। অন্তত এমন ক্রিকেট খেলুক, যাতে ম্যাচের চতুর্থ দিন পর্যন্ত লড়াই করার স্বপ্ন দেখা যায়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

seven + eleven =