সংকট নয়, বাংলাদেশ এখন এনার্জি ট্রাপে আটকা পড়েছে

জ্বালানি বিদ্যুতের অব্যাহত আমদানি নির্ভরতা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। জ্বালানি খাত নিয়ে চলমান অবস্থাকে কোনোভাবেই কেবল সংকট বলা যাবে না। দেশ আসলে একটি এনার্জি ট্রাপের মধ্যে পড়েছে। নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের পরিকল্পিত ব্যবহার ও এনার্জি ট্রানজিশনে সঠিক কৌশল নিতে ব্যর্থ হলে মধ্য আয়ের দেশে পৌঁছানোর চেষ্টা ঝুঁকিতে পড়বে।

‘ফিউচার অব এনার্জি ইন বাংলাদেশ: সিকিউরিটি, সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট অপরচুনিটিজ’ শীর্ষক এক সেমিনারে উপরের কথাগুলো বলেছেন, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।

তিনি বলেন, দেশে জ্বালানি খাতে অনেক ভালো নীতি আছে। কিন্তু কী অর্জন করতে চাই সেটার জন্য ফোকাস সুনির্দিষ্ট করতে হবে। আর জ্বালানি ট্রাপ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বেসরকারি খাতকে ভয়েস রেইজ করতে হবে। সর্বপরি গৃহীত উদ্যোগ বাস্তবায়নে মনিটরিং জোরদার করার জন্য পাবলিক প্রাইভেট পাটর্নারশিপ নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) এই রাউন্ড টেবিলে সূচনা বক্তব্য রাখেন চেম্বারের সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ। তিনি বলেন, বন্ধ শিল্প কারখানা চালু করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ৪০,০০০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। কিন্তু শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় নিয়ামক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে এই ধরনের উদ্যোগ কোনো কাজে আসবে না। তিনি মনে করেন, গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর জন্য ভাসমান ও স্থলভাগে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন দ্রুততার সাথে নিশ্চিত করতে হবে। আর বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমানোর জন্য নিজস্ব কয়লা উত্তোলন ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য অর্জনযোগ্য কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, রফতানি বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের জন্য শিল্পে নতুন নতুন বিনিয়োগ পাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। জ্বালানি বিদ্যুতের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাইস ইনডিকেশন দরকার। যাতে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা করতে পারে।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার ও ব্যবসায়ীদের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।

তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন ও উদ্ভাবনী উদ্যোগের পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

আজ বিসিআই কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই রাউন্ড টেবিলে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকসের লিড অ্যানালিস্ট-এর চিফ এনার্জি এনালিস্ট ইঞ্জি. শফিকুল আলম। তিনি তার উপস্থাপনায় বলেন, দেশে এখন জ্বালানি-বিদ্যুতের আমদানি নির্ভরতা ৬৫.৪ শতাংশ। অর্থবছর ২০২১ থেকে অর্থবছর ২০২৫ পর্যন্ত এই পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ১৪.৮ শতাংশ। আর এই সময়কালে দেশের বিদ্যুৎ খাতে রাজস্ব ঘাটতি বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৭২ শতাংশ। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ আমদানি নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করতে পারে। বিশ্বের নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ৩৩.৮ শতাংশ জ্বালানি পাওয়া গেলেও গত বছর বাংলাদেশে তার পরিমাণ ছিল মাত্র ২.৩ শতাংশ। ফলে ফসিল ফুয়েল থেকে পরিকল্পিত গ্রিন ট্রানজিশন বাংলাদেশকে সহায়তা করবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক সিনিয়র সচিব সিদ্দিক জুবায়ের বলেন, জ্বালানি খাতে যে সংকট সৃষ্টি হচ্ছে তা দীর্ঘদিন থেকে সকলের জানা থাকলেও এটা থেকে বেরিয়ে আসার যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নবানয়নযোগ্য শক্তির বিকাশ নিশ্চিত করতে হলে সরকারের জমি ও সঞ্চালন কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। আর বিনিয়োগ পাওয়ার জন্য সঠিক নীতি গ্রহণ করতে হবে। তা হলে বেসরকারি খাত দ্রুততার সাথে দেশে নবানয়যোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ করতে সক্ষম হবে।

বিআইপিপিএ সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের উচ্চমূল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় নিমামক হচ্ছে আমাদের বিপুল পরিমাণ আমদানি নির্ভরতা। অন্যদিকে ভারত, শ্রীলংকা, ভিয়েতনাম, পাকিস্তানের বিবেচনায় বাংলাদেশে বিদ্যুতের বিক্রি দাম কম। অন্যদিকে বিপুল সাবসিডি নিয়ে বিপিডিবি টিকে থাকার চেষ্টা করছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য উৎপাদন খরচের বিবেচনায় দাম সমন্বয় করার কোনো বিকল্প নেই।

ডেভিড হাসনাত বলেন, কেবল মাত্র ফুলবাড়ির কয়লা উত্তোলন করা হলে তা দিয়ে ৩০ বছর পর্যন্ত ৭,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। সরকারের উচিত আর সময় নষ্ট না করে নিজস্ব কয়লা উত্তোলন ও ব্যবহার শুরু করা।

বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট ইনামুল হক খান বলেন, বর্তমানে তৈরি পোষাক খাত থেকে রফতানি আয় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পরিকল্পনা অনুসারে ২০৩০ সালের মধ্যে তা ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার কথা। কিন্তু জ্বালানির সরবরাহ অনিশ্চয়তা ও দাম এই খাতের লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার ক্রেতাদের পক্ষ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন ফুট প্রিন্ট কমানোর চাপ আছে। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু সরকারের সঠিক নীতি সহায়তা ছাড়া তৈরি পোষাক খাত বর্তমান সংকট থেকে বেরুতে সক্ষম হবে না।

বিএসআরইএ সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ১০,০০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন অবশ্যই সম্ভব। আর সেটা করতে হলে বিশ্বের অপরাপর দেশে সাফল্য অর্জনের কৌশল অনুসরণ করতে হবে। সোলারের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে জমি ও সঞ্চালন সুবিধা এবং নীতি সহায়তা দেওয়া হলে বেসরকারি খাত ফসিল ফুয়েলের চেয়ে সাশ্রয়ী দামে বিদ্যুৎ সরবরাহ দিতে সক্ষম হবে।

এনার্জি এন্ড পাওয়ার সম্পাদক মোল্লাহ আমজাদ হোসেন বলেন, গ্যাস সংকট থেকে শিল্প খাতকে রক্ষা করতে হলে ভোলাকে দ্রুততার সাথে গ্রিডে যুক্ত করতে হবে। একই সাথে ছাতক ও পার্বত্য চট্টগ্রামে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে জরুরি কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। এতে ২ বছরের মধ্যে নতুন গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য শক্তি বিশেষ করে সোলার বিকাশের জন্য সরকারের উচিত জমি ও সঞ্চালন সুবিধা দিয়ে নিলামের মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগ আহ্বান করা। এতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৬ সেন্টের নিচে পাওয়া সম্ভব।

রাউন্ড টেবিলের অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিটিএমএর শাহেদ আলম, বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা পরিষদের সদস্য (অতিরিক্ত সচিব) ড. মো. রফিকুল ইসলাম, বিসিআই-এর ভাইস চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী প্রমুখ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 × three =