সিলেট টেস্টে নিয়ন্ত্রণ ওয়েস্ট ইন্ডিজের হাতে, চাপে বাংলাদেশ

সালেক সুফী

ঘটনাবহুল দ্বিতীয় দিন শেষে সিলেট টেস্টে চালকের আসনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। প্রথম ইনিংসে ৩৫৬ রান করার পর দিনশেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৩ উইকেটে ৮৮। হাতে ৬ উইকেট নিয়ে স্বাগতিকরা এখনো পিছিয়ে ২৬৮ রানে। ফিল্ডিংয়ের সময় গোড়ালিতে চোট পেয়ে নির্ভরযোগ্য ওপেনার সাদমান ইসলাম মাঠ ছাড়েন। তাঁর এমআরআই পরীক্ষা চলছে। এই টেস্টে তাঁর ব্যাটিংয়ে ফেরার সম্ভাবনা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। সব মিলিয়ে ম্যাচের বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

উইকেটকে এখনই মাইনফিল্ড বলার সুযোগ নেই। তবে এই উইকেটে বাংলাদেশের পেস সেনসেশন হাসান মাহমুদ দুর্দান্ত বোলিং করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংস ৩৫৬ রানে থামিয়েছেন। অন্যদিকে ক্যারিবীয় পেসার ও স্পিনাররা নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেংথে বোলিং করে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের চাপে রেখেছেন। আগামীকাল বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা দীর্ঘ সময় উইকেটে টিকে থাকতে না পারলে ম্যাচে জয় তো দূরের কথা, পরাজয় এড়িয়ে সিরিজে ধবলধোলাইয়ের লজ্জা থেকে মুক্তি পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

দিনের শুরুতে ৪ উইকেটে ২৩৪ রান নিয়ে ব্যাটিং শুরু করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আগের দিন সেঞ্চুরি করা আমির জাঙ্গু ১১১ এবং জাস্টিন গ্রিভস ৩৩ রানে অপরাজিত ছিলেন। পঞ্চম উইকেটে দুজনের ১০৬ রানের জুটি বড় সংগ্রহের সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। তবে জাঙ্গু ১৩৩ রানে পৌঁছানোর পর দুর্দান্ত ইনসুইঙ্গারে তাঁর স্টাম্প ভেঙে দেন হাসান মাহমুদ। একই ওভারে ইনিংসের অন্যতম সেরা বলে শূন্য রানে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক রোস্টন চেজকেও ফিরিয়ে দেন তিনি।

২৬৪ থেকে ৩০১ রানের মধ্যে মাত্র ২৭ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে অতিথিরা। এই ধাক্কায় বাংলাদেশকে ম্যাচে ফেরানোর কৃতিত্বের বড় অংশই হাসানের। ইনিংসে ৬ উইকেট নিয়ে তিনি নিজের নিয়ন্ত্রিত সুইং বোলিংয়ের অসাধারণ প্রদর্শনী দেখিয়েছেন। এটি তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ারের পঞ্চম পাঁচ উইকেটের কীর্তি। পাঁচটি ভিন্ন দেশে—অস্ট্রেলিয়া, ভারত, পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাংলাদেশে—এমন অর্জন তাঁর বোলিং ক্যারিয়ারে বিশেষ মাইলফলক।

তবে হাসানের অসাধারণ বোলিংয়ের পরও ওয়েস্ট ইন্ডিজের লেজের ব্যাটসম্যানরা লড়াই চালিয়ে গেছেন। ওয়ারিকন ২৭*, জশুয়া বিশপ ২৩, শামার জোসেফ ১৬ এবং জেইডেন সিলস ১৫ রান যোগ করেন। ফলে ৩০১ রানে ৮ উইকেট হারানোর পরও দলটি ৩৫৬ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। হাসান ৬/৯০ এবং মেহেদী হাসান মিরাজ ২/৮২ উইকেট নেন। তাসকিন আহমেদও দুটি উইকেট পেলেও তাইজুল ইসলাম ও নাঈম হাসান কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি। শরিফুল ইসলাম অথবা এবাদত হোসেন দলে থাকলে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হয়তো ৩০০–৩২০ রানের মধ্যে আটকে রাখা সম্ভব হতো। তবে ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যানদের দৃঢ়তা ও শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতার প্রশংসা করতেই হবে।

বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, ফিল্ডিংয়ের সময় গোড়ালিতে চোট পেয়ে স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়তে হয় ওপেনার সাদমান ইসলামকে। তাঁর অনুপস্থিতিতে কয়েকটি বিকল্প থাকা সত্ত্বেও তানজিদ তামিমের সঙ্গে ওপেনিংয়ে পাঠানো হয় নাঈম হাসানকে। নতুন বলে এই উইকেটে ব্যাটিং চ্যালেঞ্জিং—তবু আগে কখনো ওপেন না করা নাঈমকে কেন এই দায়িত্ব দেওয়া হলো, তা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রত্যাশিতভাবেই বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি তিনি।

অন্যদিকে তামিমও উইকেটে স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত গ্রিভসের বলে অভিষিক্ত কেভিন উইকহ্যামের দুর্দান্ত উড়ন্ত ক্যাচে ফিরতে হয় তাঁকে। নাজমুল হোসেন শান্ত ও তাওহীদ হৃদয় কঠিন পরিস্থিতিতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ৬৫ বলে ১৮ রান করা শান্তকে দুর্দান্ত ইনসুইঙ্গারে ফিরিয়ে দেন শামার জোসেফ। ৫১ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ তখন বিপর্যয়ে।

দিনের শেষ ভাগে মুশফিকুর রহিম ও তাওহীদ হৃদয় কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাঁদের অবিচ্ছিন্ন জুটি থেকে আসে ৩৭ রান। দিনশেষে হৃদয় ২৯ এবং মুশফিক ১৯ রানে অপরাজিত। তবে ৮৮/৩ সংগ্রহ নিয়ে বাংলাদেশ এখনো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ম্যাচ জিতে সিরিজে সমতা ফেরানোর চিন্তা বাংলাদেশের জন্য বিলাসিতা। আপাতত লক্ষ্য হওয়া উচিত ধৈর্য ধরে ব্যাটিং করে প্রথম ইনিংসের ঘাটতি কমানো এবং পরাজয় এড়ানো। বহুদিন পর ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট দলকে বেশ সুশৃঙ্খল ও লড়াকু মনে হচ্ছে। তাদের খেলায় দৃশ্যমান এই পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পরবর্তী পর্বে দলটিকে গুরুত্বের সঙ্গে হিসাব করতে হবে।

আগামীকাল সকালে মুশফিক, হৃদয়, লিটন ও মিরাজদের কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। দেখা যাক, তৃতীয় দিন কার জন্য কী বার্তা নিয়ে আসে।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম ইনিংস: ৩৫৬ অলআউট

আমির জাঙ্গু ১৩৩, কেভিন উইকহ্যাম ৬১, জাস্টিন গ্রিভস ৫১, ওয়ারিকন ২৭*; হাসান মাহমুদ ৬/৯০, মেহেদী হাসান মিরাজ ২/৮২, তাসকিন আহমেদ ২/৯০।

বাংলাদেশ: ৮৮/৩

তাওহীদ হৃদয় ২৯*, মুশফিকুর রহিম ১৯*, নাজমুল হোসেন শান্ত ১৮; জাস্টিন গ্রিভস ১/১০, জেইডেন সিলস ১/২৪, শামার জোসেফ ১/২৪।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

12 + four =