সালেক সুফী
প্রাথমিক জ্বালানির সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং ক্রমবর্ধমান জ্বালানি নিরাপত্তা সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের অবদান বাড়াতে সরকার সময়োপযোগী কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ঘোষণা করা হয়েছে বিভিন্ন আর্থিক ও অর্থনৈতিক প্রণোদনা। এসব উদ্যোগের ফলে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ খাতে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি এ খাতে কিছু ঝুঁকি ও কারিগরি চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সংকটের সুযোগে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে একটি গোষ্ঠীর তৎপরতাও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহল মনে করছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কারিগরি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিবিড় সমন্বয়, কার্যকর তদারকি এবং সমন্বিত কৌশল গ্রহণ জরুরি। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ, সীমিত আয়তনের ও কৃষিনির্ভর দেশে বড় আকারের গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে ভূমির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডেরও সক্ষমতার সীমা আছে। বিশেষ করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে গ্রহণ করার সুযোগ সীমিত।
দিনের নির্দিষ্ট সময়ে গ্রিডের চাহিদা, উৎপাদন ও সঞ্চালন সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে কতটা সৌরবিদ্যুৎ গ্রহণ করা সম্ভব, তা নির্ধারিত হয়। ফলে চাইলেই যেকোনো সময়ে ইচ্ছামতো অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত নেট মিটারগুলোর স্মার্ট মিটার না হওয়ায় জাতীয় লোড ডেসপ্যাচ সেন্টার (এনএলডিসি) এবং স্কাডা থেকে এসব স্থাপনার বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্রিডে সরবরাহ সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগও সীমিত।
জানা মতে, বর্তমান অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় জাতীয় গ্রিড অদূর ভবিষ্যতে সর্বোচ্চ ৪,০০০ মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ গ্রহণ করতে পারবে না। অথচ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০,০০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ কীভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত ও ব্যবস্থাপনা করা হবে, তা নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এই লক্ষ্য অর্জনে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুতের একটি বড় অংশ অঞ্চলভিত্তিক বিতরণকেন্দ্রিক উৎপাদন বা ডিস্ট্রিবিউটেড জেনারেশনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবহারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং উৎপাদন ও ব্যবহারের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে ভারসাম্য তৈরি করা সহজ হবে। নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে গ্রিডের স্থিতিশীলতা রক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পেতে হবে। এ ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কায় নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্রিড ব্যবস্থাপনা নিয়ে সৃষ্ট সংকট থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা নিতে পারে।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে অস্ট্রেলিয়া উন্নত দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশটির সরকারি গবেষণা সংস্থা সিএসআইআরও (CSIRO) উদ্ভাবিত ডাইনামিক অপারেটিং এনভেলপ (ডিওই) পদ্ধতি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ পদ্ধতিতে গ্রিডের বিভিন্ন অংশের তাৎক্ষণিক উৎপাদন ও চাহিদার তথ্য বিশ্লেষণ করে বিদ্যুৎ সরবরাহের সীমা নির্ধারণ করা হয়। ফলে গ্রিডের ধারণক্ষমতা ও পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ বিদ্যুৎ গ্রহণ করা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশে এ ধরনের পদ্ধতি চালু করতে হলে বিদ্যুৎ সঞ্চালন গ্রিড এবং ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের নেট মিটারিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। এ জন্য স্মার্ট মিটার স্থাপন, রিয়েল-টাইম ডেটা পর্যবেক্ষণ, উন্নত গ্রিড ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কারিগরি দক্ষতা বাড়াতে হবে। শুধু সৌর প্যানেল স্থাপন করলেই হবে না; উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিরাপদে গ্রিডে যুক্ত ও কার্যকরভাবে ব্যবহারের সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে।
সরকার প্রণোদনা ঘোষণার পর অনেক উদ্যোক্তা সৌরবিদ্যুৎ খাতে ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহী হয়েছেন। ইতোমধ্যে নানা মানের বিপুল পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানি করে মজুত করার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এসব পণ্যের কারিগরি মান যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দেশে পর্যাপ্ত আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ—সোলার প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির গুণগত মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থাগুলোর উচিত শীর্ষস্থানীয় কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নিয়ে দ্রুত কার্যকর মান যাচাই ব্যবস্থা গড়ে তোলা। নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রত্যাশা অনুযায়ী হবে না, বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়বে এবং সরকারের সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি সংস্থাগুলোর নিবিড় তদারকি ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। সরকার ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় আর্থিক ও অর্থনৈতিক প্রণোদনা ঘোষণা করেছে এবং নীতিগত সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। সরকারি অফিস ও স্থাপনাগুলোর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের জন্য অর্থ বরাদ্দও দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করে আর্থিকভাবে লাভবান হতে শুরু করেছে।
তবে সৌরবিদ্যুতের এই সম্ভাবনাকে টেকসই সাফল্যে রূপ দিতে হলে শুধু বিনিয়োগ ও স্থাপনা বাড়ালেই চলবে না। গ্রিড আধুনিকায়ন, স্মার্ট মিটারিং, ব্যাটারি সংরক্ষণ, মানসম্মত সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এবং দক্ষ জনবল তৈরির ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাপক জনসচেতনতা ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার ও আমদানিনির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সালেফ সূফি, জ্বালানি বিশ্লেষক