আমলা নিয়ন্ত্রিত জ্বালানি-বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ভুল পথে হাঁটছে

জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ ব্যাবস্থাপনায় আগের সরকারগুলোর মতো আমলা নির্ভরতার ভুল পথে হাঁটছে। বিএনপি জোট সরকার ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এবার সরকার পরিচালনার দায়িত্বে এসেই ভঙ্গুর অর্থনীতি আর সংকট পথে থাকা জ্বালানি বিদ্যুৎ পরিস্থিতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল। এর সাথে কয়দিন পরেই ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল আক্রমণ করলে যুদ্ধ বেঁধে গেল। যুদ্ধ প্রতিক্রিয়ায় আরব বিশ্ব এবং পারস্য উপসাগরের দেশজুলোর জ্বালানি স্থাপনাসমূহ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া সমগ্র বিষের মতো বাংলাদেশেও সংক্রমিত হলো ভয়াবহ জ্বালানি সঙ্কট।

পূর্ববর্তী সরকারগুলোর ভুল পরিকল্পনায় বাংলাদেশ নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ মাটির নিচে রেখে ক্রমাগত আমদানিকৃত জ্বালানি আর বিদ্যুতের উপর নির্ভরশীল হয়ে জ্বালানি নিরাপত্তাকে নাজুক করে  ফেলেছিল। এই জ্বালানির সিংহভাগ আসে আরব এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। সরকার আমলাদের পরামর্শে তড়িগড়ি করে সঙ্কটের শুরুতেই জ্বালানি রেশনিং করে জনমনে আতংক ছড়িয়ে দিয়েছিল।

এইসঙ্গে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল অশুভ সিন্ডিকেটগুলোর জ্বালানি মজুদ আর কালোবাজারির। পরিণতি যুদ্ধের প্রায় দুই মাস পেরিয়ে যাওয়া এবং বিকল্প সূত্র থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি জোগাড় করার পরেও আনাড়ি জ্বালানি সরবরাহ চেন  ব্যবস্থপনার কারণে সঙ্কট এখন মহামারীর রূপ নিয়েছে। এদিকে গ্রীষ্ম মৌসুম শুরু হওয়ায় বিদ্যুৎ চাহিদা বেড়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

সবাই জানে গ্রিড সংযুক্ত উৎপাদন ক্ষমতা ২৯,০০০ মেগাওয়াটের বেশি থাকলেও বাংলাদেশ জ্বালানি সংকট আর বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের কারিগরি সীমাবদ্ধতায় এমনিতেই ১৫৫০০-১৬০০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করতে পারেনি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ জ্বালানি সংকটে তীব্রতর এখন সেই সক্ষমতা ১৪০০০-১৪৫০০ মেগাওয়াটে সীমিত করেছে। ২৫০০০-৩০০০০ মেগাওয়াট ঘাটতি দেশজুড়ে বিদ্যুৎ লোড শেডিং শুরু করেছে।

এলোমেলো হয়ে যাওয়ার উপক্রম জ্বালানি ব্যাবস্থাপনা। সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থাগুলোর বিপুল বকেয়া থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন  সক্ষমতার একটি বিরাট অংশ এবারের গ্রীষ্মের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় অব্যবহৃত থাকার শংকা দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে ৭-৮ ঘন্টা লোড শেডিং জন জীবন বিপন্ন করে  তুলেছে।

সরকার হয়তো আমলাদের পরামর্শে সংকটের শুরুতে সংসদে এবং বাইরে সংকট স্বীকার করেনি। বার বার বলেছে, দেশে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুদ  আছে। কিন্তু সরকারি সংস্থাগুলো জ্বালানি সরবরাহ চেন ব্যাবস্থাপনায় নিদারুণভাবে বার্থ হওয়ায় জ্বালানি ডিপোসমূহ থেকে পাম্পসমূহে চাহিদামতো জ্বালানি সরবরাহ হয়নি। ঢাকাসহ সারা দেশে অনেক পেট্রল পাম্প বন্ধ রয়েছে। বাকি পাম্পগুলোতে জ্বালানি ব্যাবহারকারীদের দীর্ঘ লাইন গ্রাহকদের  হুতাশ সৃষ্টি করেই চলছে।

শুধু যানবাহন না, কৃষকরা সেচের জন্য ডিজেল, বিদ্যুৎ পাচ্ছে না, জেলেরা ট্রলার নিয়ে মাছ শিকারে সাগরে যেতে পারেনি, সারাদেশে পণ্য পরিবহনে খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্যাসের অভাবে একটি বাদে বাকি সব সার কারখানা বন্ধ থাকায় সার সংকট সৃষ্টির আশংকা সৃষ্টি হয়েছে। এমনি যখন অবস্থা তখন সরকার এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে পাশ কাটিয়ে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করেছে। প্রতিক্রিয়ায় চক্রাকারে সংযুক্ত সব কিছুর মূল্য বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতি হবে সন্দেহ নেই।

দেশজুড়ে যখন হাহাকার পার্লামেন্ট তখন কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বাহাসে ব্যস্ত থাকার পর অবশেষে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের সাংসদদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করেছে জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকটের বিষয় আলোচনা, বিশ্লেষণ করে জরুরি ভিত্তিতে করণীয় নির্ধারণের জন্য।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সর্বপর্যায়ে কৃচ্ছতা, জ্বালানি বিদ্যুতের দক্ষ ব্যবহার আর সরবরাহ চেন নিবিড় তদারকি ছাড়া বিকল্প নেই। একইসঙ্গে নিজেদের জ্বালানি অনুসন্ধান উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাজানো জ্বালানি প্রশাসন বহাল রেখে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো যাবে না। সরকারকে বিষয় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ শুনে পেশাদারি নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে।

সরকার কিন্তু আগের সরকারগুলোর ব্যর্থতা এবং বৈষয়িক সংকটকে দীর্ঘ দিন অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। জনগণ চায় স্বস্তি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 + four =