কপ ১৭: জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইয়েরেভান পথনকশা দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান সিভিল সোসাইটির

আফরোজা হোসেন

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বৈশ্বিক উদ্যোগ জোরদার করতে প্রায় ৫০টি সিদ্ধান্ত এবং নতুন ‘ইয়েরেভান পথনকশা’ গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে জাতিসংঘের ১৭তম জীববৈচিত্র্য সম্মেলন (সিবিডি কপ১৭)। তবে সম্মেলনে স্বীকার করা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে জীববৈচিত্র্য রক্ষার ২৩টি বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিশ্ব এখনও সঠিক পথে নেই।

সম্মেলনে জীববৈচিত্র্য বিষয়ক কনভেনশন (সিবিডি), কার্টাজেনা বায়োসেফটি প্রটোকল এবং নাগোয়া অ্যাকসেস অ্যান্ড বেনিফিট-শেয়ারিং প্রটোকলের সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। কুনমিং-মন্ট্রিল গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ফ্রেমওয়ার্ক (কেএমজিবিএফ) বাস্তবায়নে অগ্রগতির প্রথম বৈশ্বিক পর্যালোচনায় স্টেট অব বায়োডাইভার্সিটি অ্যাকশন প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।

২০৩০ সাল পর্যন্ত অবশিষ্ট সময়ে করণীয় নির্ধারণ করেছে ইয়েরেভান পথনকশা। এর অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে প্রকৃতির ক্ষতি করে এমন ভর্তুকি ও প্রণোদনা বন্ধ বা সংস্কার, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা বৃদ্ধি, জাতীয় বাজেট ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় জীববৈচিত্র্যকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা।

কপ১৭-এর সভাপতি হামবারজুম মাতেভোসিয়ান বলেন, “গত দুই সপ্তাহে আমরা দেখিয়েছি যে মতপার্থক্য দূর করা যায়, অঙ্গীকারকে সিদ্ধান্তে রূপ দেওয়া যায় এবং সহযোগিতার মাধ্যমে ফল অর্জন সম্ভব।” তাঁর মতে, পথনকশাটি জাতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, অর্থায়ন সংগ্রহ, বিজ্ঞান ও পর্যবেক্ষণ জোরদার এবং সমাজের সব অংশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সম্মিলিত অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

সিবিডির নির্বাহী সচিব অ্যাস্ট্রিড শোমেকার বলেন, আগামী চার বছরে কেএমজিবিএফ বাস্তবায়নে গতি আনতে হবে। তিনি বলেন, “প্রকৃতিকে রক্ষা করতে গিয়ে আমরা একই সঙ্গে তার ধ্বংসে অর্থায়ন চালিয়ে যেতে পারি না” । তাঁর মতে, প্রয়োজনীয় অর্থ দেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে হবে এবং দৈনন্দিন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে জীববৈচিত্র্যকে বিবেচনায় নিতে হবে।

সম্মেলনে সংরক্ষিত এলাকা ও বনজ জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণীর টেকসই ব্যবস্থাপনা, আগ্রাসী বহিরাগত প্রজাতি, সামুদ্রিক ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য, সিনথেটিক বায়োলজি, জীববৈচিত্র্যকে বিভিন্ন খাতে অন্তর্ভুক্ত করা এবং জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত জীবের ঝুঁকি মূল্যায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন হলো সিবিডির অনুচ্ছেদ ৮(জে)-এর আওতায় নতুন স্থায়ী সহায়ক সংস্থার কার্যপ্রণালির বিষয়ে ঐকমত্য। ‘সেভান গাইডলাইনস’ নামে পরিচিত এই সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য নীতি ও বাস্তবায়নে আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ জোরদার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অর্থায়ন ও উদ্যোগ

সম্মেলনে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নতুন অর্থায়ন ও উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর মধ্যে গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটির নবম পুনঃঅর্থায়ন ও গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ফ্রেমওয়ার্ক ফান্ডের আওতায় ৫৬০ মিলিয়ন ডলার, স্পিসিস রিকভারি অ্যালায়েন্সের মাধ্যমে ৫০০ মিলিয়ন ডলার এবং প্রকৃতিতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে ভ্যালু নেচার ফান্ডের মাধ্যমে ৩৩০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ রয়েছে।

এ ছাড়া প্রকৃতির ক্ষতিকর প্রণোদনা সংস্কার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের জীববৈচিত্র্য বন্ড ও বিনিয়োগ ইনকিউবেটর, বন সংরক্ষণে প্রস্তাবিত মডেল আইন এবং জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহি জোরদারে নতুন সূচক ও পরিমাপক চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাস্তবায়ন ও জবাবদিহির দাবি সিভিল সোসাইটির

সিভিল সোসাইটি সংগঠন ও জীববৈচিত্র্যবিষয়ক অধিকারকর্মীরা কেএমজিবিএফ বাস্তবায়নে বহুপক্ষীয় সহযোগিতার অঙ্গীকারকে স্বাগত জানালেও বলেছেন, আলোচনায় গৃহীত সিদ্ধান্ত ও অর্থায়নের ঘোষণা মাঠপর্যায়ে পরিমাপযোগ্য ফলাফলে রূপ নিতে হবে।

তাদের উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অর্থায়নের ঘাটতি, প্রকৃতির ক্ষতি করে এমন কর্মকাণ্ডে সরকারি ও বেসরকারি অর্থের প্রবাহ অব্যাহত থাকা এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের ভূমি, সম্পদ ও জীবিকাসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তে অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

অধিকারকর্মীরা স্বচ্ছ পর্যবেক্ষণ, শক্তিশালী জবাবদিহি এবং অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানে ন্যায্য প্রবেশাধিকারের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশ এবং সরাসরি সংরক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত জনগোষ্ঠীর কাছে সহায়তা পৌঁছানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক ইনগার অ্যান্ডারসন বলেন, সম্মেলনের লক্ষ্য ছিল বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য কাঠামোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা। তিনি বলেন, “ইয়েরেভানে আমরা আবারও পরিবেশবিষয়ক বহুপক্ষীয় সহযোগিতার সাফল্য দেখেছি” । তাঁর মতে, দেশগুলো সমঝোতায় পৌঁছে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা মানুষ ও প্রকৃতির জন্য অগ্রগতি নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।

২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে হাতে রয়েছে আর মাত্র চার বছর। এখন ইয়েরেভানে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ। নীতি পরিবর্তন, প্রতিশ্রুত অর্থ ছাড় এবং প্রকৃতি ও মানুষের জীবনে দৃশ্যমান উন্নতির মাধ্যমে অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে।

সিবিডির পরবর্তী সম্মেলন কপ১৮ ২০২৮ সালে ইকুয়েডরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আগে দেশগুলোকে প্রমাণ করতে হবে, বৈশ্বিক অঙ্গীকার বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নিয়ে জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জন্য পরিমাপযোগ্য সুফল বয়ে আনতে পারে।

আফরোজা হোসেন, সম্পাদক রঙ বেরঙ এবং ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, এনার্জি এন্ড পাওয়ার

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

three + twenty =