জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিডি), কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়কে সহনশীলতা কার্যক্রমের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। খবর বাসস
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের জলবায়ু সম্পর্কিত মোট ব্যয়ের ৫৩ শতাংশের বেশি বরাদ্দ রয়েছে এই তিন দপ্তরের জন্য।
বাজেট নথি অনুযায়ী, মোট ৫১ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকার জলবায়ু বরাদ্দের সিংহভাগই এই তিন দপ্তরের মাধ্যমে অভিযোজন ও সহনশীলতা বৃদ্ধি কর্মসূচিতে ব্যয় করা হবে। এটি জনগণ, খাদ্য ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় সরকারের ধারাবাহিক অগ্রাধিকারকে তুলে ধরে।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জলবায়ু অর্থায়নের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশ এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে জলবায়ু ঝুঁকি, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ একই সঙ্গে সামনে এসেছে।
তিনি বলেন, ‘এ প্রেক্ষাপটে জলবায়ু অর্থায়ন শুধু সহায়তার উৎস নয়; এটি সহনশীলতা, উদ্ভাবন এবং টেকসই উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটকও।’
স্থানীয় সরকার বিভাগকে জলবায়ু-সম্পর্কিত কার্যক্রমের জন্য ১১ হাজার ২১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা সবগুলো মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিভাগের মোট বাজেটের ২৭.৮৮ শতাংশই জলবায়ু খাতে ব্যয় করা হবে।
স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোজন কার্যক্রম বাস্তবায়নে সরকারের প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে জলবায়ু সহনশীল গ্রামীণ সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, পানি নিষ্কাশন উন্নয়নে খাল খনন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সেবা নিশ্চিতে কাজ করছে বিভাগটি।
অন্যদিকে, কৃষি মন্ত্রণালয় জলবায়ু কর্মসূচির জন্য ১০ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে, যা মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেটের ৩৬.৭৮ শতাংশ। এই বরাদ্দের আওতায় লবণাক্ততা, খরা ও বন্যা সহনশীল জাতের ফসল- যেমন ব্রি ধান-৬৭ উদ্ভাবনের পাশাপাশি জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ও মাটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
মন্ত্রণালয়টির বরাদ্দের ৯৫ শতাংশের বেশি ব্যয় হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে। এতে পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতিতে কৃষি উৎপাদন ধরে রাখার অগ্রাধিকার প্রতিফলিত হয়েছে।
অন্যদিকে, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৫ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট ব্যয় মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেটের ৫৫.৩১ শতাংশ, যা সব মন্ত্রণালয়ের মধ্যে অনুপাতে সর্বোচ্চ।
নদীভাঙন প্রতিরোধ, বন্যা ব্যবস্থাপনা, ভূমি পুনরুদ্ধার ও লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের মাধ্যমে অবকাঠামোভিত্তিক অভিযোজন কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিচ্ছে মন্ত্রণালয়টি।
এ খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নৌপথের নাব্যতা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি জলবায়ুজনিত পানি-সম্পর্কিত ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা জোরদার করা হবে।
বাজেটের এসব অগ্রাধিকার সামগ্রিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কৌশলগত দিকনির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটটি ১০টি কৌশলগত অগ্রাধিকারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। যার মধ্যে জীবন, প্রকৃতি, পরিবেশ ও পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে দেশকে সুরক্ষা দেওয়া এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই, সবুজ, জলবায়ু-সহনশীল ও বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা এর লক্ষ্য।’
সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি আরও বলেন, জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলা সরকারের অন্যতম মূল লক্ষ্য।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, জলবায়ু বাজেট দেশের চ্যালেঞ্জ এবং ‘জলবায়ু-সহনশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দৃঢ় অঙ্গীকার’-উভয়ই প্রতিফলিত হয়েছে।
এলজিডি, কৃষি মন্ত্রণালয় ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মিলিত এই বিনিয়োগ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের সহনশীলতা কৌশল স্থানীয় অবকাঠামো জোরদার করা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।