ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তরে ১২ দফা ঘোষণা দিয়ে শেষ হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসব

আফরোজা হোসেন

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং সামাজিক ও পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বানের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসব ২০২৬। বুধবার (২৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) তিন দিনব্যাপী এ উৎসবের সমাপনী দিনে ন্যায়সংগত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে ১২ দফা ঘোষণা দেওয়া হয়।

২৬ থেকে ২৮ অক্টোবর বুয়েটের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে আয়োজিত এ উৎসবের যৌথ আয়োজক ছিল অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ, বুয়েট, জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (জেটনেট-বিডি) এবং বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব এনার্জি অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট (আইইএসডি)। এতে নীতিনির্ধারক, গবেষক, বিনিয়োগকারী, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তা, উন্নয়ন সহযোগী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও তরুণ উদ্ভাবকেরা অংশ নেন।

উৎসবের উদ্বোধন করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সরকারি লক্ষ্যের কথা জানান। ২৭ অক্টোবর বুয়েটে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আমাদের বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবের মুখে ফেলেছে। ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০২৬–২০৩০ সময়ে যাতে ১০,০০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য শক্তি সক্ষমতা যুক্ত করা যায় তারজন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যক্রম সহজ করতে একটি বিশেষ নবায়নযোগ্য জ্বালানি আইন প্রণয়নের কাজ চলছে।”

মন্ত্রী সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের ওপর শুল্ক প্রত্যাহার, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে উৎসাহ প্রদান এবং নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রণোদনা দেওয়ার সরকারি উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন। পারমাণবিক, জীবাশ্ম ও নবায়নযোগ্য উৎসের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ স্বীকার করে তিনি গ্রিড আধুনিকায়নের উদ্যোগের কথা জানান।

নীতিমালা ও বিনিয়োগে গুরুত্ব

উৎসবের ১২ দফা ঘোষণায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য পৃথক আইন প্রণয়ন, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণ, কৃষির সঙ্গে সৌরবিদ্যুতের সমন্বয়ে অ্যাগ্রিভোল্টাইকস প্রযুক্তির প্রসার, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড আধুনিকায়ন এবং ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ, গ্রিন বন্ড এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে সবুজ অর্থায়ন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি ও আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দেশীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় উঠে আসে।

শেষ দিনের আলোচনায় চারটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পায়—জ্বালানি নীতি ও সুশাসন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অর্থায়ন ও বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো এবং সামাজিক ও পরিবেশগত সুরক্ষা। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, উচ্চাভিলাষী নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সুস্পষ্ট নীতিমালা, পূর্বানুমানযোগ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণ কাঠামো এবং সরকারি সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, গবেষক ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

‘বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অর্থায়ন ও বিনিয়োগ’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন খান। অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের হেড অব প্রোগ্রাম অ্যান্ড এনগেজমেন্ট কাজী মোরশেদ আলম।

আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি তানজিনা দিলশাদ, গ্রিনার গার্মেন্টস ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নূরে আলম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স বিভাগের পরিচালক এ কে এম নুরুন নবী।

আলোচকেরা নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে সহজলভ্য অর্থায়ন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং দেশীয় কারিগরি দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও নীতিগত অঙ্গীকারকে বাস্তবায়নযোগ্য বিনিয়োগ প্রকল্পে রূপ দিতে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

প্রযুক্তি ও অবকাঠামোবিষয়ক অধিবেশনে নির্ভরযোগ্য নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে গ্রিড আধুনিকায়ন, জ্বালানি স্টোরেজ ব্যবস্থা এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়।

তরুণদের অংশগ্রহণ ও উদ্ভাবন

উৎসবে তরুণদের অংশগ্রহণ ছিল অন্যতম আকর্ষণ। ‘অঙ্গীকার থেকে কমিউনিটি: বাংলাদেশের এনডিসি ৩.০-এর মাধ্যমে ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তর’ শীর্ষক তরুণদের সংলাপে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের পাশাপাশি সৌরচালিত সেচব্যবস্থা এবং ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়।

তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, সবুজ উদ্যোক্তা তৈরি এবং জ্বালানি রূপান্তরে তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে আগামী ১২ মাসের মধ্যে একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি শিল্পের দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়টিও ১২ দফা ঘোষণায় গুরুত্ব পেয়েছে।

উৎসবের উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি মেলায় দেশীয়ভাবে উদ্ভাবিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির পাশাপাশি বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন প্রযুক্তি ও সেবা প্রদর্শন করা হয়। এতে উদ্ভাবক, ব্যবসায়ী ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়।

উদ্ভাবন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে ফেলাইট প্রজেক্ট, দ্বিতীয় হয় কার্বন ক্রেডিট বিডি প্রজেক্ট এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করে আইইউবি ফর্মুলা-ই প্রজেক্ট। বিজয়ী দলগুলো সনদ ও প্রাথমিক অর্থায়ন পায়। এ ছাড়া ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি), বুয়েট ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের তিনটি সেরা একাডেমিক পোস্টারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

অন্তর্ভুক্তিমূলক জ্বালানি রূপান্তরের আহ্বান

১২ দফা ঘোষণায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের ফলে বিদ্যমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য যেন আরও না বাড়ে, তা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে নারী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।

জলবায়ু অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং প্রকল্পের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাবের স্বাধীন পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের সুফল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর পাশাপাশি তাদের জীবিকা ও পরিবেশ সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তি হস্তান্তর, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

ন্যায়সংগত জ্বালানি ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও সুফল তুলে ধরে কাকতারুয়া পাপেট থিয়েটারের পরিবেশনা উৎসবে জনসম্পৃক্ততার একটি সাংস্কৃতিক মাত্রা যোগ করে।

বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে ঘোষণার সাফল্য

সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সংসদ সদস্য জাহরাত আদিব চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন অ্যাকশনএইড ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সোসাইটির বোর্ড চেয়ার ইব্রাহিম খলিল আল-জায়েদ।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির সমাপনী বক্তব্য দেন। বুয়েটের অধ্যাপক এম এ এ শওকত চৌধুরী এবং অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশনবিষয়ক ব্যবস্থাপক ও জেটনেট-বিডির সদস্যসচিব আবুল কালাম আজাদ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

উৎসবের ১২ দফা ঘোষণা বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের জন্য একটি নীতিগত ও বিনিয়োগভিত্তিক কর্মসূচির দিকনির্দেশনা দিয়েছে। তবে এসব সুপারিশের কার্যকারিতা নির্ভর করবে সরকারের বাস্তব পদক্ষেপ, অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বাস্তবায়নের ওপর।

বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ নয়; বরং এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন, যা হবে সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, পরিবেশবান্ধব এবং সবার জন্য সহজলভ্য।

আফরোজা হোসেন, সম্পাদক, রঙ বেরঙ এবং ব্যবস্থাপনা সম্পাদক এনার্জি এন্ড পাওয়ার

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

two + 7 =