বাংলাদেশ ক্রিকেটের ছন্দপতন: ব্যর্থতা কি শুধু মাঠের?

সালেক সুফী

মাত্র কিছুদিন আগেই অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে ক্রিকেটের পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। দেশের মাটিতে পাকিস্তানকে টেস্ট সিরিজে ধবলধোলাই করেছিল। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটেও উন্নতির ধারাটি ছিল লক্ষণীয়। অথচ স্বল্প সময়ের ব্যবধানে সেই বাংলাদেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে সাদা বলের ক্রিকেটে জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানের কাছে হেরেছে। দেশের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্টেও হয়েছে শোচনীয় পরাজয়।

দীর্ঘদিনের অধারাবাহিকতা কাটিয়ে যখন বাংলাদেশ সব ফরম্যাটে ধারাবাহিক হয়ে উঠতে শুরু করেছিল, তখন এমন ছন্দপতনকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার কারণ নেই। জাতীয় দলের খেলোয়াড়েরা কি হঠাৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ক্রিকেট খেলতে ভুলে গেলেন? দলের রসায়নে কি অজানা কোনো কারণে বিরূপ প্রভাব পড়েছে? স্কোয়াড ও একাদশ নির্বাচন কি যথাযথ হচ্ছে? টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুলকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তই বা কেন নেওয়া হলো? দল নির্বাচনে কি নাজমুল হাসান পাপনের মতো কারও প্রভাব রয়েছে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন নানা প্রশ্ন ঘুরছে। শীর্ষস্থানীয় কনটেন্ট নির্মাতারাও বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করছেন।

প্রশ্ন জাগে, যে পাকিস্তান কিছুদিন আগেই বাংলাদেশের কাছে টেস্ট সিরিজে ধবলধোলাই হয়েছিল, তারাই কীভাবে ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্ট জিতে নিল? কয়েকটি ম্যাচে তারা তুলে নিয়েছে অবিস্মরণীয় জয়। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষ আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়েকে নিয়ে আয়োজিত ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টেও বাংলাদেশ নিজেদের মেলে ধরতে পারেনি। পাকিস্তান যখন উন্নতির পথে এগোচ্ছে, তখন বাংলাদেশের ক্রিকেটে কেন এই ছন্দপতন?

২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের অন্যতম কিংবদন্তি ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ক্রিকেট প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বুলবুল আইসিসির চাকরি ছেড়ে বিসিবির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দেশের ক্রিকেটের উন্নয়নে তিনি কিছু ব্যতিক্রমী পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। উইকেটের মানোন্নয়ন, আম্পায়ারিংয়ের উন্নতি এবং তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিকেট ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগের পাশাপাশি বিশ্ববরেণ্য কিউরেটর ও অভিজ্ঞ আম্পায়ার নিয়োগ দিয়েছিলেন। বিসিবির দুর্নীতি নির্মূলেও কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে ভারতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়ে তাঁর নেতিবাচক অবস্থানকে ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয়।

নির্বাচিত বিএনপি সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের পর তামিম ইকবালের নেতৃত্বাধীন বিসিবি বুলবুলের নেওয়া অনেক পরিকল্পনা বাতিল করে আবার গতানুগতিক ধারায় ফিরে গেছে। আন্তর্জাতিক মানের বিপিএল আয়োজন স্থগিত হয়েছে, নিয়োগ পাওয়া বিশেষজ্ঞদের চুক্তিও বাতিল করা হয়েছে। জাতীয় দলের সাম্প্রতিক ছন্দপতনের সঙ্গে এসব পরিবর্তনের কোনো সম্পর্ক আছে কি না তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের পেস বোলিং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রশংসা কুড়িয়েছে। মিরপুর শের-ই-বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের বিপক্ষে যে উইকেটে বাংলাদেশ জয় পেয়েছিল, সেটি ছিল সবুজ ঘাসে ঢাকা, পেস ও বাউন্স সহায়ক পিচ। নাহিদ রানা দলে না থাকলেও তাসকিন আহমেদ, হাসান মাহমুদ, শরিফুল ইসলাম ও এবাদত হোসেনের মতো পেসার ছিলেন। তারপরও কেন বাংলাদেশ আবার পুরোনো ধীর ও স্পিননির্ভর উইকেটে ফিরে গেল?

যে উইকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনার জোমেল ওয়ারিকান, রোস্টন চেজ ও জশুয়া বিশপ বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের বিপাকে ফেলেছেন, সেখানে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজের মতো অভিজ্ঞ স্পিনাররা কেন কার্যকর হতে পারলেন না? ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল বাংলাদেশ সফরের আগে ভারতের চেন্নাইয়ে স্পিন সহায়ক উইকেটে অনুশীলন করে প্রস্তুতি নিয়েছিল। দলের কয়েকজন খেলোয়াড় শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ও ওয়ানডে সিরিজেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলেছেন।

এসব বিষয়ে কি বিসিবি ও টিম ম্যানেজমেন্ট যথেষ্ট অবহিত ছিল?

আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলার স্বপ্ন দেখলে প্রতিটি সিরিজ ও ম্যাচের জন্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রতিপক্ষের শক্তি, দুর্বলতা, প্রস্তুতি এবং নিজেদের খেলোয়াড়দের সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়ে একাদশ ও উইকেট নির্বাচন করতে হবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের সাম্প্রতিক ছন্দপতনে মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিরও প্রভাব রয়েছে।

আমি এখনো মনে করি, সঠিক একাদশ নির্বাচন করে উপযুক্ত উইকেটে খেলতে পারলে বাংলাদেশ সিলেট টেস্ট জিতে ধবলধোলাই এড়াতে পারে। তবে কাজটি যে এখন অনেক কঠিন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ভালো ক্রিকেট খেলেই জয় পেয়েছে—সেটিও স্বীকার করতে হবে।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই সংকট থেকে উত্তরণে প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, ধারাবাহিক পরিকল্পনা এবং দল নির্বাচন ও প্রস্তুতিতে পেশাদারিত্ব। সাময়িক সাফল্যে আত্মতুষ্ট না হয়ে ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়ার এখনই সময়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

four + one =