মেসির ৮৫ ফুটের ভাস্কর্যের পাদদেশে উল্লাস, বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ঘিরে উৎসবে মাতল দেশ

বুয়েনস এইরেস/কুতরাল কো, ১৬ জুলাই ২০২৬ : ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে নাটকীয়ভাবে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার পর আনন্দ-উল্লাসে ফেটে পড়েছে আর্জেন্টিনা। রাজধানী বুয়েনস এইরেস থেকে শুরু করে দক্ষিণাঞ্চলের প্যাটাগোনিয়ার ছোট্ট শহর কুতরাল কো—সবখানেই বিজয় উৎসবে মেতে ওঠেন সমর্থকেরা। রয়টার্স

বিশেষভাবে নজর কাড়ে নিউকেন প্রদেশের কুতরাল কো শহর। প্রায় ৪০ হাজার মানুষের এই শহরটি সম্প্রতি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু লিওনেল মেসি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসে। ৮৫ ফুট (২৬ মিটার) উঁচু ওই ভাস্কর্যের পাশে বিশাল পর্দায় সেমিফাইনাল ম্যাচ দেখার আয়োজন করা হয়। সেখানে প্রায় ৩০০ সমর্থক একসঙ্গে খেলা উপভোগ করেন।

ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই আনন্দধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এক গোলে পিছিয়ে থেকেও ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেওয়ায় সমর্থকদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো।

স্থানীয় বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সী লুকাস রোমেরো বলেন, “এটি ছিল কষ্টার্জিত একটি জয়। মেসি দেশের জন্য যা করেছেন, এই ভাস্কর্য তারই যথাযথ স্বীকৃতি।”

ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার এই সেমিফাইনাল ম্যাচটি কেবল ফুটবলীয় লড়াই ছিল না; এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ, ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড (আর্জেন্টিনার ভাষায় মালভিনাস) যুদ্ধ এবং ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল—সবই নতুন করে আলোচনায় আসে ম্যাচকে ঘিরে।

ম্যাচ শুরুর আগে আর্জেন্টিনার ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিয়াররুয়েল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছিলেন, “ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এটি শুধু আরেকটি ম্যাচ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মালভিনাস, দিয়েগো, লিওর শেষ বিশ্বকাপ এবং ইতিহাসের আবেগ।”

কুতরাল কো শহরের অর্থনীতির বড় অংশ নির্ভর করে কাছের ভাকা মুয়ের্তা অঞ্চলের তেল ও গ্যাস শিল্পের ওপর। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শেল তেল ও গ্যাসের মজুদ রয়েছে এই এলাকায়। গত জুনে স্থানীয় শিল্পী আলদো বেরোইসার নির্মিত ৮৫ ফুট উঁচু মেসির ভাস্কর্য উদ্বোধনের মাধ্যমে শহরটি নতুন পরিচিতি লাভ করে। হাঁটু গেড়ে আকাশের দিকে আঙুল উঁচিয়ে থাকা হাস্যোজ্জ্বল মেসির এই ভাস্কর্যকে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মেসি স্মৃতিস্তম্ভ বলে দাবি করা হয়েছে।

২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর এবারের আসরের শুরুতে আর্জেন্টিনাজুড়ে বিশ্বকাপ নিয়ে উত্তেজনা তুলনামূলক কম ছিল। অনেকের ধারণা ছিল, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন আগেই পূরণ হওয়ায় চাপও কম থাকবে।

তবে টুর্নামেন্ট যত এগিয়েছে, ততই বদলে গেছে পরিস্থিতি। প্রতিটি জয়েই বুয়েনস এইরেসের রাজপথে নেমে এসেছে হাজারো সমর্থক। একাধিক ম্যাচে পিছিয়ে থেকেও আর্জেন্টিনার নাটকীয় প্রত্যাবর্তন দেশজুড়ে উদ্বেগ ও আবেগ দুটোই বাড়িয়ে দেয়। এমনকি ম্যাচের সময় অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি নিয়ে দেশটির কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের সতর্কতামূলক সাক্ষাৎকারও প্রকাশিত হয়।

ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত হওয়ার পর রাজধানী বুয়েনস এইরেসের রাস্তায় আবারও নেমে আসে হাজারো মানুষ। জাতীয় পতাকা হাতে গান, স্লোগান আর গাড়ির হর্নে মুখর হয়ে ওঠে শহর।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মারিয়ানো গেচিক বলেন, “আবেগে আমি অভিভূত। এটি আবারও প্রমাণ করল—প্রতিকূলতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি, লড়াই আর অদম্য মানসিকতাই আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় পরিচয়। আমরা বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা পাওয়ার যোগ্য।”

এখন শিরোপা ধরে রাখার পথে আর্জেন্টিনার সামনে শেষ বাধা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। ১৯৬২ সালের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস গড়ার হাতছানি এখন লিওনেল মেসিদের সামনে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

eleven + 17 =