মায়ামিতে বিশ্বকাপ উৎসব: মাঠের লড়াইয়ের বাইরে আর্জেন্টিনা–কেপ ভার্দে ম্যাচের রঙিন গল্প

রঙবেরঙ ডেস্ক: মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা ও কেপ ভার্দের রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষ হয়েছে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ৩-২ ব্যবধানের জয় দিয়ে। তবে এই ম্যাচের গল্প শুধু পাঁচটি গোল কিংবা অতিরিক্ত সময়ের নাটকেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গ্যালারি, স্টেডিয়ামের বাইরের পরিবেশ এবং দুই দেশের সমর্থকদের আবেগও ম্যাচটিকে বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় উপলক্ষে পরিণত করেছে।

ম্যাচ শুরুর অনেক আগেই মায়ামির রাস্তাঘাট আকাশি-সাদা আর নীল-লাল রঙে ছেয়ে যায়। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের ঢেউয়ের পাশাপাশি নজর কাড়ে কেপ ভার্দের ছোট কিন্তু প্রাণবন্ত সমর্থকগোষ্ঠী। আটলান্টিকের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটির পতাকা হাতে পরিবার-পরিজন নিয়ে হাজির হন প্রবাসী কেপ ভার্দিয়ানরাও। অনেকেই বলছিলেন, ফল যাই হোক, বিশ্বকাপে নিজেদের দেশের এমন উপস্থিতিই তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।

স্টেডিয়ামের বাইরে সকাল থেকেই ছিল উৎসবের আমেজ। লাতিন সঙ্গীত, আফ্রিকান ঢোলের তালে নাচ, মুখে জাতীয় পতাকার রঙ আঁকা শিশু-কিশোর, স্মারক জার্সি ও পতাকা বিক্রির দোকান—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ যেন এক আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় রূপ নেয়।

ম্যাচ শুরুর আগে গ্যালারিজুড়ে সবচেয়ে বেশি ধ্বনি ওঠে লিওনেল মেসির নাম ধরে। তবে ম্যাচ যত এগিয়েছে, ততই কেপ ভার্দের লড়াকু ফুটবল দর্শকদের মন জয় করে নেয়। ১-০ পিছিয়ে থেকেও সমতায় ফেরা, পরে অতিরিক্ত সময়েও দ্বিতীয়বার গোল করে ম্যাচে ফিরে আসার পর নিরপেক্ষ দর্শকদের বড় একটি অংশও কেপ ভার্দের প্রতিটি আক্রমণে করতালি দিতে শুরু করেন।

বিশেষ করে গোলরক্ষক ভোজিনহার একের পর এক দুর্দান্ত সেভে পুরো স্টেডিয়াম বারবার বিস্ময়ে ফেটে পড়ে। ৪০ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক মেসিসহ আর্জেন্টিনার একাধিক নিশ্চিত গোলের সুযোগ রুখে দিয়ে ম্যাচটিকে দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তায় ধরে রাখেন।

কেপ ভার্দের সমতা ফেরানো দ্বিতীয় গোলের পর গ্যালারিতে দেখা যায় ভিন্ন এক দৃশ্য। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মুখে উদ্বেগ, আর কেপ ভার্দের সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে যেন ছোট্ট দ্বীপদেশটির স্বপ্ন বাস্তব হয়ে উঠছে। ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত “কেপ ভার্দে, কেপ ভার্দে” ধ্বনিতে মুখর ছিল স্টেডিয়ামের একাংশ।

অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার সমর্থকদের আবেগও ছিল চোখে পড়ার মতো। শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতী গোলে দল এগিয়ে যাওয়ার পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন তারা। শেষ বাঁশি বাজতেই খেলোয়াড়দের সঙ্গে গ্যালারির সমর্থকদের উল্লাসে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এটি ছিল সহজ কোনো জয় নয়।

ম্যাচ শেষে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যেও দেখা যায় সৌহার্দ্যের ছবি। অনেক আর্জেন্টাইন সমর্থক কেপ ভার্দের খেলোয়াড়দের দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান। কেউ কেউ ছোট্ট দেশটির পতাকা হাতে ছবি তোলেন, আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেপ ভার্দের সাহসী পারফরম্যান্সকে বিশ্বকাপের অন্যতম অনুপ্রেরণার গল্প হিসেবে তুলে ধরেন।

স্টেডিয়াম ছাড়ার সময়ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কেবল মেসি নন; ছিল কেপ ভার্দের অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ। অনেক দর্শকের মন্তব্য, স্কোরবোর্ডে জয় আর্জেন্টিনার হলেও হৃদয় জিতে নিয়েছে কেপ ভার্দে।

মায়ামির সেই রাত তাই শুধু একটি নকআউট ম্যাচ নয়; ছিল ফুটবলের সৌন্দর্য, আবেগ, বৈচিত্র্য এবং ছোট একটি দেশের বড় স্বপ্ন দেখার অনন্য উদযাপন। ২০২৬ বিশ্বকাপের স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে থাকবে আর্জেন্টিনা-কেপ ভার্দের এই মহারণ। ছবি- রয়টার্স

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ten + 17 =