পেলে-ম্যারাডোনা-এমবাপ্পেকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপের নতুন রেকর্ডের রাজা মেসি

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তবে এই জয়ের রাতে গোল না করেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। দুই গোলে অ্যাসিস্ট করে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের একাধিক রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন এবং পেলে, দিয়েগো ম্যারাডোনা ও কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ছাড়িয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছেন।

আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেমিফাইনালে ৫৫ মিনিটে এন্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। কিন্তু শেষ মুহূর্তে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন করে আর্জেন্টিনা। ৮৫ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ সমতা ফেরান এবং যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে বদলি খেলোয়াড় লাউতারো মার্টিনেজ জয়সূচক গোল করেন। দুটি গোলেই নিখুঁত অ্যাসিস্ট করেন মেসি।

গোল করতে না পারলেও বিশ্বকাপে টানা ১১ ম্যাচে গোল অথবা অ্যাসিস্ট করার বিরল কীর্তি গড়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। গত ৬০ বছরের বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটি সর্বোচ্চ ধারাবাহিক অবদান।

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সবচেয়ে বেশি ১০টি অ্যাসিস্ট এখন মেসির দখলে। এ ক্ষেত্রে তিনি পেলে ও ফ্রান্সের আঁতোয়ান গ্রিজমানকে অনেক পেছনে ফেলেছেন; তাদের দুজনেরই অ্যাসিস্ট চারটি।

চলতি বিশ্বকাপে মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে যৌথভাবে সর্বোচ্চ আটটি করে গোল করেছেন। এছাড়া চারটি করে অ্যাসিস্ট নিয়ে দুজনই যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন। পাঁচটি অ্যাসিস্ট নিয়ে তালিকার শীর্ষে আছেন ফ্রান্সের মাইকেল ওলিসে।

বিশ্বকাপের গত ৬০ বছরের ইতিহাসে চতুর্থ ফুটবলার হিসেবে সেমিফাইনালে এক ম্যাচে একাধিক অ্যাসিস্ট করার কীর্তিও গড়েছেন মেসি।

বিশ্বকাপে ৩৩ ম্যাচে মেসির সরাসরি গোল-অবদান এখন ৩৩টি—এর মধ্যে রয়েছে ২১ গোল ও ১২ অ্যাসিস্ট। এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা এমবাপ্পের অবদান ২৫টি।

আরেকটি অনন্য রেকর্ডের খুব কাছাকাছিও পৌঁছে গেছেন মেসি। গত ৬০ বছরের বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ৯৯টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি। আর মাত্র একটি সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলেই বিশ্বকাপে ১০০টি ‘চ্যান্স ক্রিয়েট’-এর মাইলফলক স্পর্শ করবেন। এ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন দিয়েগো ম্যারাডোনা, যার তৈরি করা সুযোগ ৭১টি।

চলতি বিশ্বকাপেই ২৫টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন মেসি। এক আসরে সবচেয়ে বেশি সুযোগ সৃষ্টির তালিকায় তিনি এখন তৃতীয়। ১৯৭৪ সালে নেদারল্যান্ডসের ইয়োহান ক্রুইফ এবং ১৯৬৬ সালে পর্তুগালের আন্তোনিও সিমোয়েশ ৩১টি করে সুযোগ তৈরি করে যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছেন। ১৯৮৬ সালে ৩০টি সুযোগ সৃষ্টি করেছিলেন ম্যারাডোনা।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে মেসি ৮.৩৫ কিলোমিটার দৌড়েছেন, যা এবারের বিশ্বকাপে অতিরিক্ত সময়ে না গড়ানো ম্যাচগুলোর মধ্যে তার সর্বোচ্চ দূরত্ব।

৩৯ বছর ২১ দিন বয়সে বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলে ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ বয়সী ফুটবলার হয়েছেন মেসি। তার ওপরে রয়েছেন ইংল্যান্ডের পিটার শিলটন (৪০ বছর ২৮৯ দিন) এবং ইতালির কিংবদন্তি গোলরক্ষক দিনো জফ (৪০ বছর ১৩০ দিন)।

এছাড়া ব্রাজিলের কিংবদন্তি কাফুর পর বিশ্বের দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার অপেক্ষায় রয়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।

অন্যদিকে, সেমিফাইনাল জিতে আর্জেন্টিনা ব্রাজিলের সমান সপ্তমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে। শুধু জার্মানিই এর চেয়ে বেশি, আটবার বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছে।

বিশ্বকাপে টানা ১৩ ম্যাচে অন্তত দুই গোল করার নতুন রেকর্ডও গড়েছে আর্জেন্টিনা। এর আগে ১৯৩০ থেকে ১৯৫৪ সালের মধ্যে উরুগুয়ে টানা ১১ বিশ্বকাপ ম্যাচে দুই বা ততোধিক গোল করেছিল।

ফাইনালে কোপা আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম দুই মহাদেশের বর্তমান দুই মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়ন শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে।

এছাড়া ১৯৯২ সালে ফিফা র‌্যাঙ্কিং চালুর পর এই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দুই দল মুখোমুখি হবে। বিশ্বকাপ শুরুর আগে আর্জেন্টিনা ছিল এক নম্বরে, আর স্পেন ছিল দুই নম্বরে।

অন্যদিকে, চারবার সেমিফাইনাল খেলেও তিনবারই ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হলো ইংল্যান্ড। একমাত্র ১৯৬৬ সালেই তারা সেমিফাইনাল পেরিয়ে শিরোপা জিতেছিল।

ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেনও ম্যাচটিতে ব্যক্তিগত একটি মাইলফলক স্পর্শ করেন। তিনি দেশের হয়ে সর্বোচ্চ ১২১টি আউটফিল্ড ম্যাচ খেলে ওয়েন রুনির (১২০) রেকর্ড ভেঙেছেন। ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ ১২৫ ম্যাচ খেলার রেকর্ড এখনও সাবেক গোলরক্ষক পিটার শিলটনের দখলে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 × one =