বাংলাদেশের তরুণ সমাজ দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ গঠনে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। তবে এখন বড় প্রশ্ন হলো, সেই শক্তিকে কীভাবে টেকসই অংশগ্রহণ, উৎপাদনশীল সুযোগ এবং অর্থবহ জাতি গঠনে রূপান্তরিত করা যায়। গত ৮ আগস্ট পিপিআরসি আয়োজিত “আজকের অ্যাজেন্ডা” ওয়েবিনারে রাজনৈতিক নবায়ন, অর্থনৈতিক সুযোগ ও সামাজিক রূপান্তরের প্রত্যাশা যখন তুঙ্গে, তখন তরুণদের বহুমুখী প্রত্যাশা, সক্ষমতা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করা হয়।
অল্টারনেটিভস-এর ন্যাশনাল অর্গানাইজিং কমিটির সংগঠক তাজনুভা জাবীন জুলাই অভ্যুত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হিসেবে তরুণদের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক আগ্রহ তৈরি হওয়ার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “জুলাই তরুণদের মধ্যে একটি শক্তিশালী বিষয়কে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে—রাজনৈতিক আগ্রহ। আমি মনে করি, চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা ব্যাংকার—যোগ্যতাসম্পন্ন তরুণদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার যে কলঙ্ক, তা ভাঙতে হবে। কারণ প্রকৃত বিকেন্দ্রীকৃত রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই আগামী দশ থেকে পনেরো বছরে আমরা একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।”
ফসল-এর প্রধান নির্বাহী সাকিব হোসেন বাংলাদেশের কৃষি খাতকে পিছিয়ে রাখা তথ্য ও প্রযুক্তির বিশাল ঘাটতির কথা তুলে ধরেন। ২০১৯ সালে ফসল প্রতিষ্ঠার পর থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি কৃষকদের মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা এবং তাদের পণ্য শেষ পর্যন্ত বাজারে পৌঁছাবে কিনা—সেই অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “একজন তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে আমি দেখেছি, প্রযুক্তি প্রতিটি খাতকে বদলে দিচ্ছে, শুধু আমাদের অন্নদাতা কৃষি খাতটি ছাড়া। তাই নিজেরাই ফসল গড়ে তুলেছি—যা প্রমাণ করে, তরুণ-নেতৃত্বাধীন উদ্ভাবন আগের প্রজন্ম যা পারেনি, সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারে।”
কৃষি উদ্যোক্তা ও কৃষিবিষয়ক কনটেন্ট নির্মাতা উম্মে কুলসুম পপি বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাতগুলোর একটি এখনও কৃষি। তিনি বলেন, “আমাদের নব্বই শতাংশ তরুণ কৃষি এড়িয়ে চলে, বেশি আয় ও সম্মানের আশায় অন্য পেশার দিকে ছোটে। কিন্তু আমাদের মাটি এতটাই উর্বর যে এই গল্প বদলে দেওয়া সম্ভব। আমি চাই, তরুণরা কৃষিকে এমন কিছু হিসেবে দেখুক, যাকে ঘিরে ভবিষ্যৎ গড়া যায়, এবং যা পরিবারের জন্য গর্বের বিষয় হয়ে উঠতে পারে।”
টংডাইংনী-এর টিম লিড দও সিং নুয়ে মারমা পার্বত্য চট্টগ্রামে অ-প্রথাগত, প্রযুক্তি-সমর্থিত ও প্রকৃতিনির্ভর শিক্ষার ওপর তার উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “তরুণরা নিজেদের মধ্যে যে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে, তা-ই প্রায়ই ভাষাগত বাধা ভাঙার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের কমিউনিটিগুলোতে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্বিন্যস্ত করতে হবে, যাতে সৃজনশীলতা লালিত হয়, মূল্যবোধ গড়ে ওঠে এবং বাস্তব জীবনের সমস্যার সঙ্গে পরিচয় ঘটে।”
আইনজীবী খালেকুজ্জামান বলেন, একটি ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হলে তার মূল কাঠামো বদলাতে হয়, আর ঔপনিবেশিক আমলের আইনের ধারাবাহিক উপস্থিতি পরিবর্তনের পথে একটি বড় বাধা। তিনি বলেন, “স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয় গঠনের উদ্যোগ বাতিল হওয়া একটি পশ্চাদপসরণ। তবে আইন সংস্কার একেবারে তৃণমূল থেকে শুরু করে গড়ে তুলতে হয়, আর এই কারণেই আমাদের প্রয়োজন এমন এক নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদ, যারা এই লড়াই এগিয়ে নিয়ে যাবে।”
২০২৪ সালের জুলাইয়ের পরের সময়টা একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে এনেছে বলে জানান মুনিম মুবাশ্বির। তিনি বলেন, “জুলাইয়ের জন্য যেসব তরুণ রক্ত দিয়েছে, তাদের অনেকের মধ্যেই এই জাতি পুনর্গঠনের দৃষ্টিভঙ্গি ও সক্ষমতা ছিল, কিন্তু তাদের কখনও সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে জায়গা দেওয়া হয়নি। এখন আমাদের দায়িত্ব হলো, পরবর্তী প্রজন্মের তরুণরা যেন শুধু তাদের ত্যাগের জন্য স্মরণীয় না থেকে, বরং তারা যে ভবিষ্যতের জন্য লড়েছে, সেই ভবিষ্যতেও অন্তর্ভুক্ত থাকে, তা নিশ্চিত করা।”
সবশেষে, পিপিআরসির চেয়ারম্যান ও অধিবেশন সঞ্চালক হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা, তা-ই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। তবে এই শক্তিকে কাজে লাগাতে হলে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে কাজ করতে হবে—তৃণমূল সংস্কার থেকে শুরু করে পরিবর্তনবিরোধী কাঠামোগত শক্তিগুলো পর্যন্ত—এবং এর জন্য ঢাকা ও এলিট গণ্ডির বাইরেও এক সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। তিনি বলেন, “তরুণরা পরিবর্তনের এই আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সম্পূর্ণ সজাগ। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, আমরা কি তাদের অবদান রাখার জন্য সঠিক পরিবেশ ও সঠিক সুযোগ দিতে পারছি কিনা।”