ধৈর্য আর পরিকল্পনাই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তামিমের সেঞ্চুরির রহস্য

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এতদিন একমাত্র সেঞ্চুরিয়ান ছিলেন শাহরিয়ার নাফিস। প্রায় দুই দশক পর সেই তালিকায় যুক্ত হলো আরেকটি নাম—তানজিদ হাসান তামিম। ডারউইন টেস্টের দ্বিতীয় দিনে ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় টেস্টেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেছেন ২৫ বছর বয়সী এই ওপেনার। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো বাংলাদেশি ব্যাটারের এটিই প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি।

তামিমের ১০১ রানের ইনিংসটি শুধু একটি ঐতিহাসিক সেঞ্চুরিই নয়, বরং তার ব্যাটিংয়ে পরিণত মানসিকতারও প্রমাণ। আগ্রাসী ব্যাটার হিসেবে পরিচিত তামিম এদিন দলের প্রয়োজন অনুযায়ী খেলেছেন। ১৯৭ বল মোকাবিলা করে ৮টি চার ও একটি ছক্কায় ১০১ রান করেন তিনি। তার সামনে ছিল মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজেলউড ও নাথান লায়নের মতো বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণ।

তবে পুরো ইনিংসে অযথা ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়নি তামিমের ব্যাটিংয়ে। ভালো বল ছেড়েছেন, অপেক্ষা করেছেন নিজের পছন্দের বলের জন্য এবং অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা বারবার পরিকল্পনা বদলালেও নিজের ছন্দ ধরে রেখেছেন।

গিলক্রিস্টের সঙ্গে কথোপকথনে তামিম বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ! এখানে খেলার সুযোগ পাওয়া দারুণ ব্যাপার। আমার জন্য এটি স্পেশাল। কারণ এবারই প্রথম এখানে খেলছি। টেস্ট ক্রিকেটে মাত্র দ্বিতীয় ম্যাচ খেলতে নেমেছি এবং সেঞ্চুরি করতে পেরেছি। আমার জন্য এটি বিশেষ।”

সেঞ্চুরির পথে তার ব্যাটিং পরিকল্পনা সম্পর্কে তামিম বলেন, “দলের চাহিদা যেমন ছিল, আমি সেভাবেই খেলার চেষ্টা করেছি। আমার মনে হয়, উইকেট বেশ ভালো। তারা আমার জন্য ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনা করছিল। আর আমি চেষ্টা করছিলাম শান্ত থেকে নিজের স্বাভাবিক ক্রিকেট খেলতে।”

অস্ট্রেলিয়ার তারকা পেসারদের বিপক্ষে সাফল্যের রহস্যও খুব সরল বলে জানিয়েছেন তামিম। নির্দিষ্ট কোনো বোলারকে নিয়ে আলাদাভাবে না ভেবে বল দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়াই ছিল তার কৌশল।

তিনি বলেন, “আমি শুধু বল দেখে, বলের মেধা অনুযায়ী খেলছিলাম। খুব বেশি কিছু করার চেষ্টা করিনি। যতটা সম্ভব স্থির থেকে তারা যেভাবে বল করছে ও পরিকল্পনা করছে, তা বুঝে খেলার চেষ্টা করছিলাম।”

এই ধৈর্য ও নিয়ন্ত্রিত ব্যাটিংই শেষ পর্যন্ত তামিমকে নিয়ে যায় তিন অঙ্কে। ১০১ রানে তার ইনিংস থামার সময় বাংলাদেশ শুধু একজন ব্যাটারের ব্যক্তিগত মাইলফলক উদযাপন করেনি, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের আগের একমাত্র টেস্ট সেঞ্চুরি এসেছিল ২০০৬ সালে ফতুল্লায় শাহরিয়ার নাফিসের ব্যাট থেকে। প্রায় ২০ বছর পর সেই কীর্তিতে ভাগ বসালেন তামিম। তবে তার সেঞ্চুরির গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তিন অঙ্ক ছোঁয়া প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার তিনি।

ডারউইনের উইকেট নিয়েও সন্তুষ্ট তামিম। প্রথম দিনের তুলনায় দ্বিতীয় দিনে ব্যাটিংয়ের জন্য পরিস্থিতি আরও ভালো হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

তামিম বলেন, “আমার মনে হয়, প্রথম দিনের তুলনায় উইকেট এখন বেশ ভালো। আমার মতে, এটি আরও ভালো হতে থাকবে। এই উইকেটে আমরা যদি স্বাভাবিক ক্রিকেটীয় শট খেলতে পারি, আমাদের জন্য ভালো হবে।”

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ এর আগে টেস্ট জয় পেলেও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জয় এখনো অধরা। ডারউইনে সেই অপেক্ষা শেষ করার মতো অবস্থান তৈরি হয়েছে কি না, তার উত্তর মিলবে ম্যাচের বাকি অংশে। তবে তামিম এখনই বড় কোনো ঘোষণা দিতে চান না। তার লক্ষ্য আপাতত পরের দুই সেশন ভালোভাবে পার করা।

তিনি বলেন, “আমাদের এখন পরের দুই সেশন ভালোভাবে খেলতে হবে। আমরা যদি ভালোভাবে সেটি করতে পারি, তাহলে আমাদের দলের জন্য অনেক ভালো হবে।”

এক দিন আগে হাসান মাহমুদের ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ যে চাপ তৈরি করেছিল, দ্বিতীয় দিনে সেই চাপকে লিডের দিকে এগিয়ে নেওয়ার কাজটি করেছেন তামিম।

আর ঐতিহাসিক সেঞ্চুরির পথে তিনি দেখিয়েছেন নিজের ব্যাটিংয়ের আরেকটি দিক—আগ্রাসনের পাশাপাশি ধৈর্য, পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী খেলা এবং বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে নিজের পরিকল্পনায় অবিচল থাকার অসাধারণ সক্ষমতা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

eight + 15 =