পাকিস্তানের সৌর বিপ্লব থেকে শিক্ষা নিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গতি আনতে হবে: সিপিডি

ঢাকা, ২৩ জুন — বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে আরও গতিশীল করতে নীতিগত সংস্কার, কর ও শুল্ক হ্রাস এবং সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ‘সৌর বিপ্লব’ বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা হতে পারে, বিশেষ করে রুফটপ সোলার ও বিতরণভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘পাকিস্তানে সৌর বিপ্লব: জাতীয় বাজেটের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা’ শীর্ষক সংলাপের আয়োজন করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

সংলাপে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়ার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে এ খাতের কার্যকর বাস্তবায়নে এখনও বেশ কিছু কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “স্বল্প সময়ে পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক বিস্তার দেশটির বিদ্যুৎ খাতের চিত্র বদলে দিয়েছে। বাংলাদেশও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে।”

তিনি জানান, চলতি বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যান (ইভি) এবং ব্যাটারি শিল্পে কিছু কর ও রাজস্ব সুবিধা রাখা হয়েছে। তবে কৃষি খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার আরও সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির আওতায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাদ ব্যবহার করে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা দেশের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সংলাপে উপস্থাপিত ‘সোলার রাশ’ শীর্ষক প্রবন্ধে গবেষক মোহাম্মদ বাসিত ঘৌরি বলেন, “বাংলাদেশ বর্তমানে সৌরবিদ্যুতের রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। তবে উচ্চ কর, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং নীতিগত জটিলতা এ খাতের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।”

তিনি জানান, ২০২৫ অর্থবছরে পাকিস্তানে সৌর প্যানেল আমদানি ১৭ দশমিক ৯ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে, যা দেশটির জাতীয় গ্রিড সক্ষমতারও বেশি। বর্তমানে পাকিস্তানে ২৮ থেকে ৩৮ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপিত হয়েছে, যার বড় অংশই বিতরণভিত্তিক ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে।

তার মতে, বিদ্যুতের উচ্চমূল্য এবং জাতীয় গ্রিড ব্যবস্থার ওপর আস্থার ঘাটতি পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুতের দ্রুত বিস্তারের প্রধান কারণ। পাশাপাশি, চীনে উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় সৌর প্যানেলের দাম কমে যাওয়াও দেশটিতে ‘সোলার রাশ’ সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

তিনি আরও জানান, ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানে প্রায় ৭৩ লাখ পরিবার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, যার বড় অংশই গ্রামীণ অঞ্চলে। এর ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ কমেছে এবং জ্বালানি আমদানি ব্যয়ও হ্রাস পেয়েছে।

সংলাপে উপস্থাপিত আরেকটি গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচি একসময় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অফ-গ্রিড বিদ্যুতায়ন উদ্যোগ ছিল, যা দুই কোটিরও বেশি মানুষের কাছে বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ কর্মসূচির গতি কমে এসেছে এবং অনেক সিস্টেম অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

গবেষণায় আরও বলা হয়, দেশে নেট-মিটারিংভিত্তিক রুফটপ সোলার স্থাপনার সংখ্যা এখনও সীমিত হলেও ধীরে ধীরে বাড়ছে। তবে উচ্চ কর, নেট-মিটারিং অনুমোদনের জটিলতা, অর্থায়নের ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা এ খাতের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ বলেন, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর-সুবিধা প্রদান করেছে এবং সেচ পাম্পসহ বিভিন্ন খাতে সৌরশক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ নীতি সহায়তা, সহজ অর্থায়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশও পাকিস্তানের মতো দ্রুতগতির সৌর রূপান্তরের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

seventeen + 3 =