ব্যাটিং ধসের পরে নির্বিষ বোলিং: বাংলাদেশের শোচনীয় পরাজয়

নিজেদের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠারত দুই ম্যাচ টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশ আট উইকেটের বিশাল ব্যাবধানে পরাজিত হয়েছে। ম্যাচের তৃতীয় দিনেই মেরুদণ্ডহীন বাংলাদেশ ব্যাটসম্যানরা ওয়েস্ট ইন্ডিজের ঘূর্ণি বোলিং মোকাবেলায় আনাড়ির মতো আত্মসমর্পন করে খাদের কিনারে পৌঁছেছিল। চতুর্থ দিন সকলে নাঈম ইসলাম হাসান মাহমুদ আর তাইজুলকে সঙ্গী করে কিছুটা লড়াই করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয়ের টার্গেট ১৭০ করেছিল।

প্রকৃতি বার বার বিঘ্ন ঘটালেও বাংলাদেশের নির্বিষ বোলিং তুলোধুনা  করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ মাত্র ২ উইকেট হারিয়ে ৩৫.১ ওভারে ১৭০ করে ৮ উইকেটের বিশাল ব্যাবধানে টেস্ট জয় করে সিরিজে ১-০ এগিয়ে যায়। অথচ এই বাংলাদেশ টেস্ট দল কিছু দিন আগেই ডারউইন টেস্টে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দাপুটে জয় পেয়েছিল। তারও আগে দেশের মাটিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সিরিজে ধবল ধোলাই অর্জন করেছিল। আশা ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে সিরিজ জয় করে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চলমান পর্বে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করবে। কেন দ্রুত এই অবনমন প্রশ্ন সবার।

যে উইকেটে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কাছে রোস্টন চেজ, ওয়ারিকনের স্পিন বোলিং খেলা সাধ্যের অতিরিক্ত মনে হয়েছে সেই উইকেটেই কেন তাইজুল, মিরাজ, নাঈমদের অনায়েসে খেলে কৃতিত্বপূর্ণ জয় পেলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ? বাংলাদেশ দলের একাদশ নির্বাচন, দলের রসায়ন, শেষ মুহূর্তে ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুলকে অপসারণ এগুলোর প্রতিক্রিয়া পড়েছে পারফরমেন্স তাৎক্ষণিক এতটুকু বলা যেতে পারে। যোগ্যতর দল হিসেবে ভালো খেলেই জয় পেয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ সিলেট টেস্ট জয় করে ধবল ধোলাই এড়াতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে।

টেস্ট ম্যাচ শুরুর আগে বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম আহত হয়ে পড়ায় তাওহীদ হৃদয়কে দলে নেয়া হয়।  অন্যতম স্ট্রাইক বোলার নাহিদ রানা এখনো ফিট না থাকা এবং দলীয় কম্বিনেশন বিবেচনায় তাসকিন আহমেদকে বিশ্রামে রেখে দুই পেসার আর তিন স্পিনার নিয়ে খেলার সিদ্ধান্ত শুরু থেকেই বাংলাদেশকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছিলো। সাম্প্রতিক সময়ে মীরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের উইকেট পেস বাউন্স সিম মুভমেন্টের জন্য প্রশংসিত হলেও কাদের পরামর্শে আবার ধীর, অসম বাউন্সের ঘূর্ণি উইকেট করা হয়েছে সেই ব্যাখ্যা বিসিবির কাছে চাওয়া যেতেই পারে।

টস জয় করে ভালোই সূচনা করেছিল বাংলাদেশ। বিশেষত উইকেটের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে ভালো ব্যাটিং করেছে সাদমান ইসলাম। ভালো সূচনা করে উইকেটে স্থিতু হয়েও উইকেট বিলিয়ে দিয়েছে মোমিনুল (২৯) আর নাজমুল শান্ত (১৯)। তাওহীদ হৃদয়কে (৪২) সঙ্গী করে চতুর্থ উইকেট জুটিতে ৮৮ রানের জুটি গড়েছিল সাদমান। এই সময় আহত হয়ে অবসরে যায় হৃদয়। প্রথম দিনশেষে ২১৩/৩ ভালো অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। সাদমান অপরাজিত ছিলো ৯৯ রানে। সেখান থেকে ৪০০+ রান করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিবে বাংলাদেশ সেটি ভাবনা থাকা স্বাভাবিক ছিল।

দ্বিতীয় দিন সকালে ১০৫ রান করে সাদমান আউট হবার পর দ্রুত পাল্টে গেলো পরিস্থিতি। তাওহীদ রিদয়, মেহেদী মিরাজসহ লেট মিডেল অর্ডার কোন প্রতিরোধ গড়তে পারেনি। একমাত্র লিটন (৪২)  একা লড়াই করে দলের সংগ্রহ করেছিল ২৭২। ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই স্পিনার ওয়ারিকন ৫/৫৩ আর জশুয়া বিশপ ২/৬১ ধস নামিয়েছিল। এখানেই বাংলাদেশ ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারায়।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল নিজেদের সামর্থ্যের সব কিছু দিয়ে লড়াই করেছে। বাংলাদেশের বোলাররা সুযোগ সৃষ্টি করলেও একের পর এক ক্যাচ মিস করায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্যাম্পবেল (৫৪), তেজনারায়ণ চন্দরপল (৫৬), জাস্টিন গ্রিভস (৪৬) আর রোস্টন চেজ (৪২*) সংগ্রহ করায় ২৪৫ রানে শেষ হয় ইনিংস। ২৭ রানের লিড পায় বাংলাদেশ। সফল বলার ছিল নাঈম ইসলাম ( ৪/৩৩), তাইজুল, মিরাজ কিছুটা নিষ্প্রভ থাকলেও  নাঈমকে কেন অনেক পরে আক্রমণে আনা হয়েছিল প্রশ্ন জাগতেই পারে।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস বাটিংয়ের সময় ব্যাটসম্যানদের সন্ত্রস্ত আতঙ্কগ্রস্ত মনে হয়েছে। উইকেটে কিছুটা অসম বাউন্স ছিল, কিছুটা স্পিন ধরলেও মাইনফিল্ডে পরিণত হয়নি। কিন্তু ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যাটিং করেছে তামিম (০), সাদমান (১৩), শান্ত (১০), তৌহিদ হৃদয় (০), লিটন দাস (৪), মেহেদী মিরাজ (৯)। ফিল্ডিং করার সময় মাথায় আঘাত পাওয়ায় ব্যাটিং করতে পারেনি মোমিনুল। কনকাশন সাব হিসাবে ব্যাট করে জাকের আলী ২২ রান করে প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করে।

তৃতীয় দিন শেষে ৭৯ রানে ৬ উইকেট হারানো বাংলাদেশের সামনে বাধার প্রাচীর গড়ে রোস্টন চেজ আর ওয়ারিকনের দুর্দান্ত বোলিং।  চতুর্থ দিন সকালে লড়াই করে নাঈম ইসলাম (৫২) দলের স্কোর ১৪২ নিয়ে গেলে ১৬৯ লিড পায় বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক চেজ (৫/৩৬) এবং ওয়ারিকন (৪.৬৫) বাংলাদেশ ইনিংসে ধস নামায়।

বাংলাদেশ কিন্তু ক্ষয়িষ্ণু উইকেটে ভালো বোলিং আর তুখোড় ফিল্ডিং করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য ম্যাচ জয় কঠিন করতে পারতো। কিন্তু হায় লড়াই করার মানসিকতাই দেখা গেলো না। বাংলাদেশের নির্বিষ বোলিং তুলোধুনা করে ব্রেন্ডান কিং (৮১*), ক্যাম্পবেল (৪৯), কেভিন হজ (৩১*) ৮ উইকেটের সহজ জয় জয় তুলে নেয়।

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই বাংলাদেশ তাদের সাজানো ফাঁদে ধরা পড়েই শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। উইকেট আর পরিস্থিতি অনেক ভালোভাবে সামাল দিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়ে ধবল ধোলাই এড়াতে বাংলাদেশকে নিজেদের মানসিকতা অনেক পরিবর্তন করতে হবে। অনেক সমীকরণ মেলাতে হবে।

সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড

বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস  ২৭২ অল আউট (সাদমান ইসলাম ১০৫, তাওহীদ হৃদয় ৪২, লিটন কুমার দাস ৩৪, ওয়ারিকন ৫/৫৩, সামার জোসেফ ২/৪১, জশুয়া বিশপ ২/৬১)

বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস ১৪২ অল আউট (নাঈম ইসলাম ৫২, জাকের আলী ২২, রোস্টন চেজ ৫/৩৬, ওয়ারিকন ৪/ ৬৩)

ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম ইনিংস ২৪৫ (তেজনারায়ণ চন্দরপল ৫৬, জন কেম্পবেল ৫৪, জাস্টিন গ্রিভস ৪৬, রোস্তন চেজ ৪৩*, নাঈম ইসলাম ৪/৩৩, মেহেদী মিরাজ ২/ ৬৫, তাইজুল ইসলাম ২/৭৬ )

ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বিতীয় ইনিংস ১৭০/২ (ব্রেন্ডন কিং ৮১, জন কেম্পবেল ৪৯, কেভেম হাজ্ ৩১ *)

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৮ উইকেটে জয়।

ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়: জমেল ওয়ারিকন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 × four =