জলবায়ু অভিযোজনে নারীর ক্ষমতায়নে জোর, বাড়ছে সরকারি বিনিয়োগ

ঢাকা, ৩ আগস্ট ২০২৬ – জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় নারীদের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে অভিযোজন কর্মসূচি জোরদার করছে সরকার। জলবায়ু-সংবেদনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, জীবিকা সুরক্ষা এবং নারীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে চলতি অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে আরও কার্যকর সুরক্ষা দেওয়া যায়। খবর বাসস

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলীয় ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। এ বাস্তবতায় তাদের অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি, জীবিকা রক্ষা এবং নিরাপদ জীবনযাপন নিশ্চিত করতে লক্ষ্যভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। বিদ্যমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং শ্রমের লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনের কারণে দুর্যোগের সময় ও পরবর্তী পর্যায়ে নারীদের ওপর দায়িত্ব ও চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ে। তাই টেকসই অভিযোজন নিশ্চিত করতে নারীকেন্দ্রিক পরিকল্পনা অপরিহার্য।

সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জলবায়ু বাজেটেও এ অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটেছে। বাজেটে নারীর ক্ষমতায়ন, জলবায়ু অভিযোজন এবং সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য পৃথক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এর মধ্যে ‘জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন ও অভিযোজনে নারীর সক্ষমতা বৃদ্ধি’ কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬ হাজার ৮৮৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এই অর্থ নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা এবং অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে ব্যয় করা হবে।

নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের জন্য বিশেষ অভিযোজন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া, বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার মতো লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। সেখানে ব্রি ধান-৬৭ চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, যাতে লবণাক্ততার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত একফসলি কৃষির পরিবর্তে গ্রামীণ নারীরা পুনরায় খাদ্য উৎপাদন ও পারিবারিক আয় বাড়াতে পারেন।

সরকারের অভিযোজন কৌশল শুধু জীবিকা উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; নারীদের প্রয়োজন বিবেচনায় জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এ লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ‘প্রত্যন্ত এলাকায় নারীদের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ’ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২২ হাজার ১৬৪ কোটি ১০ লাখ টাকা।

নবনির্মিত ও সংস্কার করা ঘূর্ণিঝড় এবং দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্রে নারীদের জন্য পৃথক স্যানিটেশন ব্যবস্থা, ওয়াশ ব্লক এবং নিরাপদ নির্ধারিত স্থান রাখা হচ্ছে, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে তাদের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা যায়।

স্থানীয় সরকার বিভাগ দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং পৃথক শৌচাগার নির্মাণও সম্প্রসারণ করছে। এর মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখা এবং স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার মান উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, জলবায়ুজনিত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে গ্রামীণ হাট-বাজারে নারীদের জন্য পৃথক বিপণন এলাকা গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে নারী উদ্যোক্তারা নিরাপদ পরিবেশে ব্যবসা পরিচালনা এবং পারিবারিক আয় বৃদ্ধি করার সুযোগ পাচ্ছেন।

এসব উদ্যোগ জলবায়ু সহনশীলতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে সমন্বিত করার বৃহত্তর জাতীয় কৌশলের অংশ।

জলবায়ু বাজেট প্রতিবেদন ২০২৬-২৭-এর ভূমিকায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশ এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে জলবায়ু ঝুঁকি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের লক্ষ্যের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তাই জলবায়ু-সহনশীল ও জলবায়ু-সংবেদনশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।”

জাতীয় বাজেট বক্তৃতায় তিনি আরও বলেন, “এবারের বাজেট দশটি কৌশলগত অগ্রাধিকারকে কেন্দ্র করে প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে দেশকে সুরক্ষিত করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই, সবুজ, জলবায়ু-সহনশীল ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা অন্যতম লক্ষ্য।”

অর্থমন্ত্রী বলেন, “আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার রূপান্তরমূলক যাত্রা শুরু করেছি, যা হবে প্রতিযোগিতামূলক, উৎপাদনশীল, ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মর্যাদাপূর্ণ।”

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়তে থাকায় বাংলাদেশ সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, জীবিকা সহায়তা এবং নারীর ক্ষমতায়নকে সমন্বিত করে লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এর মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই ও জলবায়ু-সহনশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সরকারি অঙ্গীকার আরও শক্তিশালী হচ্ছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

19 − fourteen =