বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডে সুপারস্টারদের দাপট, চমক দেখাচ্ছে নবাগতরাও

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় যৌথভাবে অনুষ্ঠিত ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের প্রথম রাউন্ড শেষে ফুটবলপ্রেমীদের সামনে উঠে এসেছে নানা নতুন বাস্তবতা। সুপারস্টারদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স, তীব্র গরমে ইউরোপীয় দলগুলোর সংগ্রাম, নবাগতদের চমক এবং নতুন প্রযুক্তির সফল ব্যবহার—সব মিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপ ইতোমধ্যেই জমে উঠেছে।

টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিশ্বের সেরা তারকারা। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি, ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে, ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন, নরওয়ের এরলিং হালান্ড এবং কলম্বিয়ার লুইস দিয়াজ নিজেদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে দলকে এগিয়ে নিচ্ছেন। অন্যদিকে পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো প্রত্যাশিত ছন্দে না থাকায় তার দলও ভুগছে।

এবারের বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত রেকর্ডও গড়ছেন তারকারা। এমবাপে সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ফ্রান্সের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন এবং বিশ্বকাপে মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বোচ্চ ১৬ গোলের রেকর্ডের আরও কাছে পৌঁছেছেন। অন্যদিকে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে মেসি বিশ্বকাপে ষষ্ঠবার অংশ নেওয়ার নজির গড়েছেন, যা তাকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পাশে বসিয়েছে।

ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপে গ্যারি লিনেকারের ১০ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেছেন। স্কটল্যান্ডের জন ম্যাকগিনও দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে বিশ্বকাপে গোল করার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন।

বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার তীব্র গরম এবং আর্দ্র আবহাওয়া। বিশেষ করে ইউরোপীয় দলগুলো এসব পরিবেশে নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দ ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। গ্রুপ পর্বের প্রথম রাউন্ডে ইউরোপের অনেক ফেবারিট দল প্রত্যাশিত ফল পায়নি। স্পেন, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড ও তুরস্ক জয় দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করতে ব্যর্থ হয়েছে।

প্রতিটি ম্যাচেই বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন বিরতি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিন মিনিটের এই বিরতিতে খেলোয়াড়দের পাশাপাশি কোচরাও কৌশল পরিবর্তনের সুযোগ পাচ্ছেন। অনেক ম্যাচেই দেখা গেছে, বিরতির পর খেলার গতি ও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। তবে এই নিয়ম নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফুটবলাররা।

টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ধারণা করা হয়েছিল, ৪৮ দলের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের অনেক ম্যাচ একঘেয়ে হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই আশঙ্কা সত্য হয়নি। এখন পর্যন্ত প্রতি ম্যাচে গড়ে ৩.১২টি গোল হয়েছে, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে গ্রুপ পর্বের অন্যতম সর্বোচ্চ গোলগড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তীব্র গরমেও আক্রমণাত্মক ফুটবল দর্শকদের বিনোদিত করছে।

এবারের সম্প্রসারিত বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া কয়েকটি দলও নজর কেড়েছে। কেপ ভার্দে স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়ে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে। নিউজিল্যান্ড ইরানের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করেছে, আর জর্ডানও শক্তিশালী অস্ট্রিয়াকে কঠিন লড়াই উপহার দিয়েছে। যদিও কুরাসাও জার্মানির কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছে, তবুও তাদের লড়াকু মানসিকতা প্রশংসা কুড়িয়েছে।

প্রযুক্তিগত দিক থেকেও এবারের বিশ্বকাপে নতুনত্ব দেখা যাচ্ছে। ম্যাচ বলের ভেতরে থাকা মাইক্রোচিপ ও ‘স্নিকো’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সুইডেন-তিউনিসিয়া ম্যাচে একটি গোলের সঠিক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা হয়েছে। বলে কার স্পর্শ ছিল, তা নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে এই প্রযুক্তি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

অন্যদিকে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের অস্থায়ী ঘাসের মাঠ নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। ফ্রান্সের আদ্রিয়েন রাবিও এবং ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র মাঠকে অতিরিক্ত শক্ত ও শুষ্ক বলে অভিযোগ করেছেন। বিশ্বকাপের ফাইনালও এই স্টেডিয়ামেই অনুষ্ঠিত হবে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বেশ কয়েকটি ম্যাচ নির্ধারিত সময়ের কয়েক মিনিট পর শুরু হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, ম্যাচপূর্ব আনুষ্ঠানিকতা এবং আয়োজক দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতির কারণে এই বিলম্ব নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সব মিলিয়ে গ্রুপ পর্বের প্রথম রাউন্ড শেষে স্পষ্ট হয়েছে যে, ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু তারকাদের আলোয় নয়, নতুন দলগুলোর আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্স, প্রযুক্তির উন্নত ব্যবহার এবং ভিন্ন আবহাওয়ার চ্যালেঞ্জ মিলিয়ে এক ভিন্নমাত্রার টুর্নামেন্টে পরিণত হয়েছে। সামনে নকআউট পর্বে প্রতিযোগিতা আরও জমে ওঠার আভাস মিলছে।

সূত্র: স্কাই স্পোর্টস

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 × 3 =