কমছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন, জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় সতর্কবার্তা

সালেক সুফী

বাংলাদেশের দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা ক্রমেই উদ্বেগজনক অবস্থার দিকে যাচ্ছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার শিল্প এবং উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

পেট্রোবাংলার ১২-১৩ জুলাইয়ের গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ তথ্য অনুযায়ী, দেশের দৈনিক গ্যাস উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ১,৬৫৮ মিলিয়ন ঘনফুটে। অন্যদিকে, দুটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনাল থেকে সরবরাহকৃত প্রায় ১,০১৫ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি যোগ করেও মোট সরবরাহ দাঁড়িয়েছে মাত্র ২,৬৭২ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ দেশের বর্তমান গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন অন্তত ১,০০০-১,২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে দেশের প্রধান গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা। একসময় যেখানে দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ১,২০০ মিলিয়ন ঘনফুট, বর্তমানে তা কমে ৭৬২ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। উৎপাদন হ্রাসের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৭-২৮ সালের মধ্যে বিবিয়ানার উৎপাদন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক প্রয়োজন ২,৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস, কিন্তু সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ৯৬২ মিলিয়ন ঘনফুট। একইভাবে সার কারখানাগুলোর প্রয়োজন ৩২৯ মিলিয়ন ঘনফুট, অথচ সরবরাহ মিলছে মাত্র ১১৮ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে বর্তমানে মাত্র দুটি চালু রয়েছে।

শিল্প খাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান গ্যাস সংকটে উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোও গ্যাসের স্বল্পচাপ ও অনিয়মিত সরবরাহের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ করছে।

এ অবস্থায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না। বাপেক্সের ৫০ ও ১০০ কূপ খনন কর্মসূচি থেকে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন আসেনি। একইসঙ্গে নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপন কিংবা স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল বাস্তবায়নের অগ্রগতিও সন্তোষজনক নয়। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য উৎপাদন-বণ্টন চুক্তির (PSC) আওতায় দরপত্র আহ্বান করা হলেও আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর আগ্রহ এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নেও গতিশীলতার প্রয়োজন রয়েছে। পেট্রোবাংলায় দীর্ঘ সময় ধরে পূর্ণকালীন চেয়ারম্যান না থাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও প্রকল্প বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে অভিজ্ঞ ও পেশাদার ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন দ্রুত কমতে থাকায় শুধু এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে—দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কোম্পানির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা, নতুন এফএসআরইউ ও স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত বাস্তবায়ন, সম্ভাবনাময় কয়লা সম্পদের ব্যবহার নিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতে, বেসরকারি বিনিয়োগে কার্যকর প্রণোদনা দেওয়া।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে আগামী কয়েক বছরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র হতে পারে। এর নেতিবাচক প্রভাব শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি তা দ্রুত বাস্তবায়নই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

one × three =