সালেক সুফী
নিজেদের দেশে আগের টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশের কাছে ধবল ধোলাই হয়েছিল পাকিস্তান। এবার ওরা বাংলাদেশে এসেছে প্রতিশোধ মিশনে হারানো গৌরব উদ্ধারের মিশনে। বাংলাদেশ কি পারবে পাকিস্তানের প্রতিশোধ মিশনকে হতাশায় পরিণত করতে? দুর্দান্ত আগ্রাসী পেস বোলিং ইউনিট, ভারসাম্য পূর্ণ আক্রমণ, গভীর আর কার্যকরী ব্যাটিং ইউনিট নিয়ে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ দেশের মাটিতে পরিচিত উইকেটে ফেভারিট থাকলেও সিরিজ জয় সহজ হবে মনে হয়না। শাহীন আফ্রিদি, হাসান আলী, মোহাম্মদ আব্বাস, নোমান আলী, সাজিদ খানের মত বলার, বাবর আজম, মোহাম্মদ রিজওয়ান শান মাসুদ, সালমান আগা, ইমামুল হক সমৃদ্ধ ব্যাটিং ইউনিট সহজে হার মানবে বলে মনে হয়না। সিরিজে ব্যাট বলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলা যেতেই পারে। কাল ৮ মে ঢাকার মীরপুরে শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের দুর্গম দুর্গে শুরু হবে সিরিজের প্রথম ম্যাচ। বদলে যাওয়া চরিত্রের স্পোর্টিং উইকেটে যে দল দ্রুত মানিয়ে নিবে খেলার জোয়ার তাদের দিকে মুখ ফেরাবে। পাকিস্তান দলে কিন্তু প্রতিষ্ঠিত অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান প্রান্তিক খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ সাদা বল ফরম্যাটে ভালো ফর্মে থাকা তানজিদ তামিম এবং গত কয়েক মৌসুম ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজেকে প্রমান করা অমিত হাসানকে স্কোয়াডে নিয়েছে। বাংলাদেশ দেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ড দলের বিরুদ্ধে ওডিআই আর টি২০ সিরিজ খেলেছে। অন্যদিকে পাকিস্তান পিএসএল শেষ করেই বাংলাদেশে এসেছে। এবার কিন্তু পিএসএলে নাহিদ রানা, শরিফুল ইসলাম আলো ছড়িয়েছে। বাংলাদেশে শুরু হয়েছে বর্ষা মৌসুম। জানিনা ঢাকা এবং সিলেটে অনুষ্ঠিতব্য টেস্ট দুইটি বৃষ্টি বাধা মুক্ত থাকবে কিনা। কিন্তু সিরিজ দুটি কিন্তু আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চলতি পর্বের অন্তর্ভুক্ত থাকায় উভয় দলের জন্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান আইসিসি টেস্ট রাংকিংয়ে পাকিস্তানের অবস্থান ষষ্ট আর বাংলাদেশ আছে নবম স্থানে।
বাংলাদেশ স্কোয়াড: নাজমুল হাসান শান্ত, মাহমুদুল হাসান জয়, সাদমান ইসলাম, তানজিদ হাসান তামিম, মোমিনুল হক সৌরভ, মুশফিকুর রহিম, লিটন কুমার দাস, মেহেদী হাসান মিরাজ, অমিত হাসান, তাইজুল ইসলাম, নাঈম হাসান, তাসকিন আহমেদ, শরিফুল ইসলাম, নাহিদ হাসান রানা, এবাদত হোসেন চৌধুরী।
পাকিস্তান স্কোয়াড: শান মাসুদ, ইমামুল হক, আব্দুল্লাহ ফজল, বাবর আজম, সালমান আগা, মোহাম্মদ রিজওয়ান, সাউদ শাকিল, আজান আওয়াজ, গাজী ঘোরী, আমাদ বাট, খুররম সাজ্জাদ, শাহীন শাহ আফ্রিদি, হাসান আলী, মোহাম্মদ আব্বাস, নোমান আলী, সাজিদ খান।
স্কোয়াডের নাম দেখেই প্রতীয়মান পাকিস্তান দলে বাবর আজম, মোহাম্মদ রিজওয়ান, শান মাসুদ, ইমামুল হক, সালমান আগা, সাউদ শাকিলদের সঙ্গে আব্দুল্লাহ ফজল, আজান আওয়াজ, গাজী ঘোরীদের মত উঠতি নবীনদের সুযোগ দিয়েছে। শাহীন আফ্রিদি, হাসান আলী, মোহাম্মদ আব্বাসের মত দক্ষ পেস বোলারদের পাশাপাশি আছে নোমান আলী, সাজিদ খানের মত প্রমাণিত দক্ষতার স্পিনার। সহজেই প্রতীয়মান সিরিজ জয়ের জন্য কোমর বেধে লড়াই করবে পাকিস্তান। বাংলাদেশের জন্য সতর্ক থাকতে হবে এই ভেবে পাকিস্তানের ব্যাটিং তারকা বাবর আজম কিন্তু এখন আগুনে ফর্মে আছে। বাবরকে পাখা মেলার সুযোগ দিলে বিপদে পড়বে বাংলাদেশ।
অন্যদিকে গত দুই মৌসুমে বাংলাদেশ ক্রিকেটে উঁচু মানের পেস বলারদের আৱিৰ্ভাৱ এবং বিকাশ কিন্তু টেস্ট দলের চরিত্র পাল্টে দিয়েছে। এমনিতেই বাংলাদেশ দল ম্যাচ জয়ী স্পিনার আছে। এখন তাসকিন, নাহিদ রানা, শরিফুল, এবাদাতদের মত বোলারদের একসঙ্গে আবির্ভাব ক্রিকেট ম্যানেজমেন্টকে দেশের মাটিতেও স্পোর্টিং উইকেট তৈরিতে উৎসাহিত করেছে। এমনকি মীরপুরের ধীর গতির ঘূর্ণি উইকেটের চরিত্র পাল্টে গেছে। ঘাসে ঢাকা পেসি বাউন্সি উইকেটে থাকছে ব্যাটসম্যান বোলারদের জন্য সমান সুযোগ।
সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে নাহিদ রানা গতি, ছন্দ, বিচক্ষণতায় বিশ্ব ক্রিকেটে আলো ছড়াচ্ছে।একজন খাঁটি পেস বোলার ক্রমাগত ১৪০ কিলোমিটার গতিতে বোলিং করলে তাঁকে উপযোগী উইকেটে কোন ব্যাটসম্যান খেলতে স্বস্তি পায়না। এর সঙ্গে যোগ করুন মুভমেন্ট আর বিষাক্ত ইয়র্কার। সবাই জানি ইমরান খান, ওয়াসিম আকরাম, শোয়েব আখতার, ওয়াকার ইউনিসদের পাকিস্তান যুগে যুগে বিশ্বত্রাস পেস বোলারদের উপহার দিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটকে সমৃদ্ধ করেছে। সেই পাকিস্তানে খেলে প্রতিভা দিয়ে নাহিদ রানা বিশ্ব ক্রিকেটে সাড়া জাগিয়েছে। এই ধরণের প্রকৃতি প্রদত্ত প্রতিভাকে যত্নে রাখা হলে বাংলাদেশের সম্পদ হবে সন্দেহ নেই। ওর সঙ্গে আছে পরিণত তাসকিন, বদলে যাওয়া শরিফুল। এই দলে সাকিব থাকলে নিঃসন্দেহে বলতাম সিরিজ জয়ী হবে বাংলাদেশ। তবে টেস্ট স্পিনার হিসাবে তাইজুল, মেরাজ এবং সঙ্গে নাঈম কিন্তু যথেষ্ট কার্যকরী। বাংলাদেশের মূল চ্যালেঞ্জ ব্যাটিং, বিশেষত টপ অর্ডার ব্যাটিং। সাদমান, জয় প্রতিভাবান সন্দেহ নেই কিন্তু ধারাবাহিকতার অভাব আছে, অধিনায়ক শান্ত টপ অর্ডারকে স্থায়িত্ব দিতে হবে। তবে মোমিনুল, মুশফিক, লিটন দলের বাটিংয়ে মূল ভরসা। নির্বাচকরা হয়ত চাইছে টপ অর্ডারে একটু আগ্রাসী ব্যাটিং তাই তানজিদ তামিমকে সুযোগ দেয়া হয়েছে। তরুণ অমিত হাসান সুযোগ পেলে হয়ত বাটিংকে সমৃদ্ধ করবে। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটিং লেজ কিছুটা দীর্ঘ। টপ এবং মিডল অর্ডারে অন্তত দুইটি লম্বা পার্টনারশীপ না হলে সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশ।
যাই হোক সিরিজটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা মুখর হবে বলা যেতেই পারে। এই সিরিজে জয়ী দল বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছাবে। বাংলাদেশ দলের জন্য শুভ কামনা।