সুইজারল্যান্ডের আলোচনা স্থগিত: নতুন চাপে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি চুক্তি, লেবাননে আবারও সংঘর্ষ

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধ অবসানে স্বাক্ষরিত ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সুইজারল্যান্ডে নির্ধারিত বাস্তবায়নসংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে। একই সময়ে লেবাননে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় পুরো শান্তি প্রক্রিয়া চাপের মুখে পড়েছে। খবর বাসস

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক অগ্রগতি হলেও মাঠপর্যায়ের উত্তেজনা এখনো প্রশমিত হয়নি। ফলে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের লুসার্ন হ্রদের তীরে অবস্থিত বুর্গেনস্টক রিসোর্টে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীরাও এতে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিল।

তবে সুইস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যে নির্ধারিত আলোচনা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আলোচনা আয়োজনের জন্য সুইজারল্যান্ড প্রস্তুত থাকলেও নতুন তারিখ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে হোয়াইট হাউস ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সফর বাতিলের ঘোষণা দেয়।

হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র বলেন, এ ধরনের বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক আলোচনা পরিচালনা করা অত্যন্ত জটিল এবং এর সময়সূচি সবসময় পূর্বানুমানযোগ্য হয় না।

তবে যত দ্রুত সম্ভব কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা পুনরায় শুরু করার আশা প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন।

ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ সতর্ক করে বলেছেন, চুক্তি লঙ্ঘন করা হলে বা অতিরিক্ত শর্ত আরোপের চেষ্টা করা হলে তেহরান কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন,“যুদ্ধের সময় তারা একবার চপেটাঘাত খেয়েছে। যদি আবার সেই পথে হাঁটতে চায়, তাহলে আরও কঠোর চপেটাঘাত পাবে।”

তার এই মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, তেহরান এখনো চুক্তিকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযান বন্ধ করা এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করা।

এ বছরের এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির আগে পাঁচ সপ্তাহব্যাপী সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়।

চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

শান্তি চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই লেবাননে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

ইসরাইলি সেনাবাহিনী শুক্রবার হিজবুল্লাহর বিভিন্ন অবস্থানে হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন।

অন্যদিকে, দক্ষিণ লেবাননে চারজন ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরাইল। শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পর এটিই ইসরাইলি বাহিনীর প্রথম প্রাণহানির ঘটনা।

এই ঘটনার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির।

তিনি বলেন,“পুরো লেবাননকে জ্বলে উঠতে হবে।”

তার এই বক্তব্য নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করেছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি জানিয়েছেন, ব্যক্তিগতভাবে ভিন্নমত পোষণ করলেও জাতীয় স্বার্থে তিনি চুক্তির অনুমোদন দিয়েছেন। তিনি বলেন,“আমি অনুমতি দিয়েছি, কারণ প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইরানি জনগণের অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার করেছেন।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যাপক চাপ প্রয়োগ করে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছে।

তবে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এখনো ওই অঞ্চলে অবস্থান করছে।

অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করতে ইচ্ছুক জাহাজগুলোকে নতুন গঠিত একটি সরকারি সংস্থার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।

ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুটে এখনো স্বাভাবিক কার্যক্রম পুরোপুরি ফিরেনি।

চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত তেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এছাড়া, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা হলে আঞ্চলিক দেশগুলোর অংশগ্রহণে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন তহবিল গঠনে সহায়তা করবে ওয়াশিংটন।

যুদ্ধ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজ দলের কিছু মিত্রের সমালোচনার মুখে পড়েছেন।

পাঁচ সপ্তাহের সংঘাতে ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হন এবং বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়।

তবে ট্রাম্প মনে করেন, অতিরিক্ত সামরিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানের কাছ থেকে আরও বড় ছাড় আদায় করা সম্ভব ছিল না।

তিনি বলেন,“আমি যদি আরও কঠোর হতে চাই, তাহলে আরও দুই বা তিন সপ্তাহ বোমা হামলা চালাতে পারি। কিন্তু তাতে কী লাভ হতো? হরমুজ প্রণালী কখনোই খুলত না।”

বিশ্লেষকদের মতে, শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হলেও বাস্তবায়নের পথ এখনো অত্যন্ত কঠিন।

সুইজারল্যান্ডে আলোচনা স্থগিত হওয়া, লেবাননে নতুন সংঘর্ষ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভিন্ন অবস্থান প্রমাণ করছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সামনে আরও দীর্ঘ ও জটিল পথ অপেক্ষা করছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

five + twenty =