ইরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্টের যৌথ হামলা

ইরানের রাজধানী তেহরানে একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ইরানি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, শহরের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে এবং আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে। একই সঙ্গে ইসরায়েল ঘোষণা করেছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে আগাম প্রতিরোধমূলক হামলা চালিয়েছে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক কর্মকর্তাও নিশ্চিত করেছেন, এই হামলা ছিল দুই দেশের সমন্বিত সামরিক অভিযান। হামলা জবাবে তেহরান ইসরাইল ও মার্কিন ঘটিতে হামলার হুশিয়ারি দিয়েছে।

ইরানের বার্তা সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, তেহরানের ইউনিভার্সিটি স্ট্রিট ও জোমহুরি এলাকায় কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছে। শহরের উত্তরাংশের সাইয়্যেদ খানদান এলাকাতেও বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে তাসনিম সংবাদ সংস্থা, যা ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর খবরে বলা হয়েছে, হামলার একটি অংশ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কার্যালয়ের কাছাকাছি এলাকায় ঘটেছে। তবে রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, খামেনি বর্তমানে তেহরানে নেই; তাঁকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

যৌথ সামরিক অভিযান

ইসরায়েলের এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এই অভিযান কয়েক মাস ধরে পরিকল্পনা করা হচ্ছিল এবং হামলার দিনক্ষণ কয়েক সপ্তাহ আগেই চূড়ান্ত করা হয়। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করেই এই হামলা চালানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা আল জাজিরাকে জানান, এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই ওই অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক যুদ্ধবিমান ও রণতরী মোতায়েন করেছিল।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ও ইসরায়েলি গণমাধ্যমও জানিয়েছে, হামলাটি দুই দেশের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের কাছে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণের চেষ্টা চলছে।

 

ইসরায়েলের দাবি

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, “ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে থাকা হুমকি দূর করতে” এই আগাম হামলা চালানো হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ।

স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে আটটার দিকে ইসরায়েলজুড়ে সাইরেন বেজে ওঠে। দেশটির সেনাবাহিনী জানায়, সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় জনগণকে সতর্ক করতে আগাম সতর্কসংকেত দেওয়া হয়েছে। জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় খাত ছাড়া স্কুল ও কর্মস্থল বন্ধ রাখা হয়েছে।

ইসরায়েল তাদের আকাশসীমা বেসামরিক উড়োজাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে। দেশটির বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে বিমানবন্দরে না যেতে অনুরোধ জানিয়েছে।

ইরানেও আকাশসীমা বন্ধ

তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, ইরানও তাদের আকাশসীমা বন্ধ করেছে। একই সময়ে কাতারে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস তাদের সব কর্মীকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছে এবং নাগরিকদেরও একই পরামর্শ দিয়েছে।

গত জুন মাসে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের বিমানযুদ্ধ হয়েছিল। তার পর থেকেই দুই দেশ একে অপরকে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বারবার সতর্ক করে জানিয়েছিল, ইরান যদি পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এগিয়ে নেয়, তবে আবার হামলা চালানো হতে পারে।

ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কূটনৈতিক আলোচনায় বসে দীর্ঘদিনের বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করেছিল। তবে ইসরায়েল জোর দিয়ে বলে, ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো পুরোপুরি ভেঙে না দিলে কোনো সমঝোতা যথেষ্ট হবে না। তারা আলোচনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকেও অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তোলে।

অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিনিময়ে তারা পারমাণবিক কর্মসূচিতে কিছু সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করতে রাজি। তবে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব তারা নাকচ করে। তেহরান আগেই সতর্ক করে বলেছিল, কোনো হামলা হলে তারা আত্মরক্ষায় পাল্টা ব্যবস্থা নেবে। প্রতিবেশী দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলারও হুঁশিয়ারি দিয়েছিল ইরান।

গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে যোগ দেয়। এর জবাবে ইরান কাতারে অবস্থিত মার্কিন আল উদেইদ বিমানঘাঁটির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে প্রতিশোধ নেয়।

পশ্চিমা দেশগুলো বরাবরই বলছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি এবং তা ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম হতে পারে। তবে ইরান বারবার দাবি করেছে, তারা পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছে না।

সর্বশেষ হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 × four =