বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্যানে কমতে পারে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ২,৫৯০ মেগাওয়াট: আইইইএফএ

ঢাকা, ২ নভেম্বর ২০২৬: প্রচলিত বাসাবাড়ির ফ্যানের পরিবর্তে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ব্রাশলেস ডাইরেক্ট কারেন্ট (বিএলডিসি) ফ্যান ব্যবহার করলে গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ২,৫৯০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে বছরে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং ভবিষ্যতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ এড়ানো যেতে পারে বলে জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)।

আইইইএফএ-এর ‘বাংলাদেশে বাসাবাড়ির শীতলীকরণ: বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্যানের ভূমিকা’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, গ্রীষ্মকালে বাসাবাড়ির ফ্যান থেকেই সর্বোচ্চ ৫,২১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা তৈরি হয়। রাত ৯টার দিকে ফ্যানের ব্যবহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। গত ২৭ আগস্ট রাত ৯টায় দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৯,০২৭ মেগাওয়াট।

দেশের ২৬টি জেলার ৪৩৫টি পরিবারের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত বাসাবাড়ির ফ্যানের মাত্র ১.৪ শতাংশ বিএলডিসি প্রযুক্তির। একটি বিএলডিসি ফ্যান সাধারণত ৩৫ ওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। বিপরীতে, প্রচলিত কম দক্ষতার ফ্যান ৭০ ওয়াট বা তার বেশি বিদ্যুৎ খরচ করে।

গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, প্রচলিত ফ্যানের পরিবর্তে বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহার করলে বছরে সর্বোচ্চ ৬,৯১৩ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সাশ্রয় হতে পারে। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ৮৯,৮৭০ কোটি টাকা বা ৭৩ কোটি ডলার। বিদ্যুৎ চাহিদা কমলে বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ওপর চাপ কমবে। এ সময়ে দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে লোডশেডিং ৩,৫০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে।

আইইইএফএ-এর বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক ও প্রতিবেদনটির লেখক শফিকুল আলম বলেন, “বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চ্যালেঞ্জ আরও বাড়িয়েছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্যানের ব্যাপক ব্যবহার চাহিদা কমাবে এবং বোর্ডের ওপর চাপ প্রশমিত করবে।”

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অদক্ষ ফ্যান প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূলধনী বিনিয়োগ এড়ানো সম্ভব হতে পারে। এই বিনিয়োগ সাশ্রয় দিয়ে দেশে বর্তমানে ব্যবহৃত সব অদক্ষ ফ্যান প্রতিস্থাপনের ব্যয় মেটানো সম্ভব বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে বিএলডিসি ফ্যানের উচ্চ প্রাথমিক মূল্য এর ব্যাপক ব্যবহারের পথে বড় বাধা। একটি প্রচলিত ফ্যানের দাম প্রায় ২,০০০ টাকা। অন্যদিকে, বিএলডিসি ফ্যানের দাম ৫,০০০ থেকে ৬,৩০০ টাকা। জরিপে দেখা গেছে, ৭৫ শতাংশ পরিবার বাজারে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্যানের প্রাপ্যতা সম্পর্কে জানে না। তবে এসব ফ্যানের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সম্ভাবনা সম্পর্কে জানার পর ৯৬ শতাংশ পরিবার তা ব্যবহারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

মাসে ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত আয় করা পরিবারগুলো দেশের মোট পরিবারের প্রায় ৪০ শতাংশ। এসব পরিবারের ক্ষেত্রে বিএলডিসি ফ্যান কেনার বিনিয়োগ বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের মাধ্যমে উঠে আসতে ৭.৭ থেকে ৯.৬ বছর লাগতে পারে। তবে বৃহৎ পরিসরে একসঙ্গে ফ্যান কেনা এবং কার্বন ক্রেডিট থেকে আয় ব্যবহার করা গেলে এই সময় কমে প্রায় ৪.৮ বছরে আসতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিএলডিসি ফ্যানের ব্যবহার বাড়াতে আইইইএফএ একটি জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণের সুপারিশ করেছে। কর্মসূচি বাস্তবায়নে একটি বিশেষায়িত জ্বালানি সেবা কোম্পানি গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্যানের সুবিধা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে এবং টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ফ্যানের জ্বালানি দক্ষতার মানদণ্ড ও লেবেলিং চূড়ান্ত করতে হবে। একই সঙ্গে দাম কমাতে বৃহৎ পরিসরে ক্রয়, নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য অর্থায়ন এবং ভবিষ্যৎ কার্বন আয় ব্যবহারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

এ ছাড়া বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে কিস্তি পরিশোধের মাধ্যমে ফ্যান কেনার অর্থায়ন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসূচির কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণে শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করেছে আইইইএফএ।

শফিকুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ খাতের চাপ বাড়তে থাকায় চাহিদা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দ্রুত সুফল পাওয়া যায়—এমন উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। “বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্যান এমনই একটি ব্যবস্থা, যা স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গেই বিদ্যুৎ চাহিদা কমাতে পারে,” বলেন তিনি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

five × 2 =