খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যে শক্তির প্রদর্শনে ইরান, ট্রাম্পের উদ্দেশে কড়া বার্তার প্রস্তুতি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন প্রস্তুতি নিয়েছে তেহরান। ছয় দিনব্যাপী এ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশীয় ঐক্য প্রদর্শনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ইরানের পাঁচটি শহরে আয়োজিত এ শোকানুষ্ঠানে এক থেকে দুই কোটি মানুষের অংশগ্রহণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সময়সূচিও এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবসের সঙ্গে প্রায় একই সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ জনগণকে ব্যাপকভাবে জানাজা ও শোকযাত্রায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এই উপস্থিতি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি জনগণের সমর্থন এবং দেশের প্রতিরোধের বার্তা বহন করবে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও ইরান শেষকৃত্য আয়োজনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একজন নেতাকে বিদায় জানানোর অনুষ্ঠান নয়; বরং রাষ্ট্রীয় সংহতি ও রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার একটি বড় কূটনৈতিক ও প্রতীকী আয়োজন।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সম্প্রচারিত ফুটেজে দেখা গেছে, খামেনির মরদেহ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছে। রাজধানীজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা, সড়ক নিয়ন্ত্রণ এবং আকাশসীমায় বিশেষ বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে।

মূল রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি শনিবার শুরু হলেও ইতোমধ্যে তেহরানের বিভিন্ন স্থানে হাজারো মানুষ শোক প্রকাশে সমবেত হচ্ছেন। কোমের জুমার খতিব আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ সাঈদি বলেছেন, জনগণের ব্যাপক উপস্থিতি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি সমর্থনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। এর জেরে ইরান পাল্টা হামলা চালায়, যা পরবর্তীতে পশ্চিম এশিয়াজুড়ে সংঘাতের বিস্তার ঘটায় এবং হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব পড়ে।

খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মুজতাবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যে প্রকাশ্যে অংশ নেবেন না বলে জানিয়েছেন ভারতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি আয়াতুল্লাহ হাকিম এলাহি। তিনি বলেন, মুজতাবা ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তাকে জনসমক্ষে না আসার পরামর্শ দিয়েছে।

শুক্রবার থেকে রাশিয়া, চীনসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তেহরানে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। শনিবার ও রোববার তেহরানে রাষ্ট্রীয় জানাজা ও বিদায় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। সোমবার রাজধানীতে প্রধান শোকযাত্রা শেষে মরদেহ নেওয়া হবে ধর্মীয় নগরী কোমে। এরপর ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় শোকানুষ্ঠান শেষে মাশহাদে ইমাম রেজার মাজার প্রাঙ্গণে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে দাফন করা হবে।

বৃহৎ এ আয়োজন সফল করতে বিভিন্ন শহরের হোটেলে বিশেষ ছাড়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ক্রীড়া কমপ্লেক্সে অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন কোনো হামলার ঘটনা ঘটলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছে তেহরান।

পর্যবেক্ষকদের মতে, খামেনির শেষকৃত্য শুধু ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান নয়; বরং সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরানের রাজনৈতিক অবস্থান, জাতীয় সংহতি এবং প্রতিরোধের বার্তা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 × five =