বিশ্বকাপে রূপকথা লিখছে কেপ ভার্দে, ছোট্ট দ্বীপ রাষ্ট্রের সাফল্যে মুগ্ধ ফুটবল বিশ্ব

মাত্র পাঁচ লাখ জনসংখ্যার ছোট্ট দ্বীপ রাষ্ট্র কেপ ভার্দে এবার ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে নিজেদের অসাধারণ পারফরম্যান্সে ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝখানে অবস্থিত দেশটি বিশ্বকাপে প্রথম অংশগ্রহণেই ইতিহাস গড়ে নকআউট পর্বে উঠে এসেছে। ৯৬ বছরের বিশ্বকাপ ইতিহাসে জনসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে শেষ ষোলোতে জায়গা করে নিয়ে নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তারা।

বিশ্বকাপের অভিষেক আসরেই স্পেন ও উরুগুয়ের মতো দুই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নের সঙ্গে একই গ্রুপে পড়েও তিন ম্যাচে অপরাজিত থেকে নকআউট নিশ্চিত করে কেপ ভার্দে। স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে রাখা এবং উরুগুয়ের আক্রমণভাগকে কার্যকরভাবে রুখে দেওয়া তাদের পরিকল্পিত ফুটবলেরই প্রমাণ। ফলে শনিবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মাঠে নামার আগে দলটিকে আর হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ দেখছেন না ফুটবল বিশ্লেষকরা।

কেপ ভার্দের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বাস্তবসম্মত ফুটবল দর্শন এবং প্রবাসী খেলোয়াড়দের দক্ষ ব্যবহারের কৌশল। পর্তুগিজ উপনিবেশ হওয়ায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কেপ ভার্দিয়ান বংশোদ্ভূত মানুষের বড় একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে। সেই প্রবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিভাবান ফুটবলারদের জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করেই শক্তিশালী দল গড়ে তুলেছে দেশটির ফুটবল ফেডারেশন।

বর্তমান বিশ্বকাপ দলে থাকা ২৬ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ১৪ জনই দেশের বাইরে জন্মগ্রহণ করেছেন। কেউ পর্তুগাল, কেউ নেদারল্যান্ডস, আবার কেউ আয়ারল্যান্ডে বেড়ে উঠেছেন। ইউরোপীয় ফুটবলের আধুনিক প্রশিক্ষণ ও কেপ ভার্দিয়ান পরিচয়ের সমন্বয় দলটিকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। ডাবলিনে জন্ম নেওয়া ডিফেন্ডার রবার্তো লোপেসকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইনের মাধ্যমে জাতীয় দলে যুক্ত করার ঘটনাও ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

মাঠের খেলায়ও সেই পরিকল্পনার প্রতিফলন স্পষ্ট। ইউরোপীয় শৃঙ্খলা ও আফ্রিকান লড়াকু মানসিকতার সমন্বয়ে কেপ ভার্দে গড়ে তুলেছে কার্যকর একটি দল। তাদের খেলার ধরন হয়তো দৃষ্টিনন্দন নয়, তবে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত পরিপক্ব। কখন চাপ সামলাতে হবে, কখন প্রতিপক্ষকে জায়গা ছেড়ে দিতে হবে এবং কখন পাল্টা আক্রমণে যেতে হবে—এসব বিষয়ে দলটির পরিকল্পনা সুস্পষ্ট।

দলের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা। স্পেনের বিপক্ষে একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে তিনি দলের অন্যতম নায়কে পরিণত হন। গ্রুপ পর্বে দুটি ক্লিন শিট ধরে রেখে নিজের অভিজ্ঞতার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। বিশ্বকাপে তার পারফরম্যান্সের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন এই গোলরক্ষক।

ভোজিনহার প্রকৃত নাম জোসিমার জোসে এভোরা দিয়াস। শৈশবের একটি ডাকনাম থেকেই ‘ভোজিনহা’ পরিচয়ে তিনি পরিচিতি পান। কেপ ভার্দে, অ্যাঙ্গোলা, মলদোভা, সাইপ্রাস, স্লোভাকিয়া ও পর্তুগালের বিভিন্ন ক্লাবে খেলার অভিজ্ঞতা এখন জাতীয় দলের জন্য মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়েছে।

তবে কেপ ভার্দের শক্তি কেবল গোলরক্ষককে ঘিরে নয়। অধিনায়ক ডিনি বোর্জেসের নেতৃত্বে রক্ষণভাগ, কেভিন পিনার মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং হেলিও ভ্যারেলা ও দাইলন লিভ্রামেন্তোর গতিময় আক্রমণ দলটিকে দিয়েছে ভারসাম্য। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের চেয়ে দলগত শৃঙ্খলা ও সংগঠিত ফুটবলই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছেন প্রধান কোচ বুবিস্তা। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক হিসেবে দেশের ফুটবলের সীমাবদ্ধতা খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। ২০২০ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর তার লক্ষ্য ছিল এমন একটি দল গড়ে তোলা, যাদের বিপক্ষে জয় পাওয়া কঠিন হবে। কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই পরিকল্পনাই বাস্তবে রূপ নিয়েছে। বিশ্বকাপে দলটি খুব বেশি গোল না করলেও শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, কৌশলগত নমনীয়তা এবং ধৈর্যের জন্য ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।

বিশ্বকাপে ওঠার পথেও ছিল তাদের দাপট। বাছাইপর্বে পাঁচ ম্যাচের সবকটিতে জয় পাওয়ার পাশাপাশি একটি গোলও হজম করেনি কেপ ভার্দে। ক্যামেরুন ও অ্যাঙ্গোলার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে পেছনে ফেলে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে মূল পর্বে জায়গা করে নেওয়ায় বর্তমান সাফল্যকে কোনোভাবেই আকস্মিক বলা যায় না।

এবার শেষ ষোলোয় তাদের প্রতিপক্ষ বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। শক্তির বিচারে দুই দলের মধ্যে ব্যবধান থাকলেও কেপ ভার্দে ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে, ফুটবলে শুধু ইতিহাস, জনসংখ্যা বা অর্থনৈতিক সামর্থ্যই সাফল্যের একমাত্র নির্ধারক নয়। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, দক্ষ নেতৃত্ব এবং অদম্য আত্মবিশ্বাস থাকলে ছোট একটি দেশও বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসতে পারে। তাই ফল যাই হোক, ২০২৬ বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের অভিযাত্রা ইতোমধ্যেই ছোট দেশগুলোর জন্য বড় স্বপ্ন দেখার অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

three × one =