সুন্দরবন অঞ্চলে সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার উদ্যোগ প্রকল্পের উদ্বোধনী কর্মশালা অনুষ্ঠিত

ঢাকায় “সুন্দরবন অঞ্চলে সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার উদ্যোগ (CRIS)” প্রকল্পের উদ্বোধনী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, বন অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, নাগরিক সমাজের সংগঠন এবং সংরক্ষণ সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

এতে সরকারি কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, সংরক্ষণকর্মী, গবেষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। সুন্দরবন অঞ্চলের টেকসই সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করাই ছিল এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।

CRIS প্রকল্পটি বাংলাদেশ বন অধিদপ্তর, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (IUCN) এবং এজেন্স ফ্রঁসেজ দ্য ডেভেলপমেন্ট (AFD)-এর অংশীদারিত্বে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য হলো সুন্দরবন ও এর আশপাশের অঞ্চলে প্রতিবেশগত স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু অভিযোজন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণকে শক্তিশালী করা।

ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালাটি প্রকল্পের উদ্দেশ্য, বাস্তবায়ন কৌশল, পুনরুদ্ধার অগ্রাধিকার, সমন্বয় কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য অংশীদারিত্বের সুযোগ উপস্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে।

উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেন, “CRIS প্রকল্পটি সুন্দরবনের জন্য একটি সময়োপযোগী ও কৌশলগত উদ্যোগ, যা একটি বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশব্যবস্থার টেকসই ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করবে, এর মাধ্যমে পরিবেশগত স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি, ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জীবিকা উন্নয়ন সম্ভব হবে।” তিনি আরও বলেন, এই উদ্যোগটি জাতীয় অগ্রাধিকার, এসডিজি এবং বৈশ্বিক জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এটি “অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারের একটি মডেল” হিসেবে কাজ করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম সরকারের সুন্দরবন রক্ষায় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বন্যপ্রাণী অপরাধ, পরিবেশগত হুমকি এবং অসতর্ক সম্পদ ব্যবহার থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশব্যবস্থাকে রক্ষা করতে আরও শক্তিশালী আইন প্রয়োগ ও সুশাসন প্রয়োজন। তিনি উপকূলীয় বাফার জোনে বনায়ন সম্প্রসারণ, ইসিএ এলাকায় শিল্পচাপ কমানো এবং নদী ও খাল পুনরুদ্ধারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন AFD বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর সেসিলিয়া কোর্তেস। তিনি বলেন, “জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা ও প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার অবশ্যই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, লিঙ্গ সমতা এবং কমিউনিটি অংশগ্রহণের সঙ্গে একসাথে এগিয়ে নিতে হবে।”

তিনি CRIS প্রকল্পকে সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিস্থাপকতা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বাংলাদেশের জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য কার্যক্রমে AFD-এর অব্যাহত সমর্থনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।

প্রকল্প পরিচালক ইমরান হোসেন বলেন, সুন্দরবন এবং এর আশপাশের জনগোষ্ঠী জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, আবাসস্থল অবক্ষয় এবং জীববৈচিত্র্য হ্রাসের কারণে ক্রমবর্ধমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, “CRIS একটি সমন্বিত উদ্যোগ, যা প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার, গবেষণা, জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা এবং কমিউনিটি সম্পৃক্ততাকে একত্রিত করে বাস্তবায়িত হবে।”

IUCN বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ বিপাশা এস. হোসেন বলেন, “CRIS প্রকল্প সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণে বিজ্ঞান, তথ্য, পুনরুদ্ধার কার্যক্রম এবং কার্যকর কমিউনিটি অংশগ্রহণকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।”

সভাপতির বক্তব্যে প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমির হোসেন চৌধুরী বলেন, সুন্দরবন একটি বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশব্যবস্থা, যা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, উপকূলীয় সুরক্ষা এবং পরিবেশগত সেবা প্রদান করে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সুন্দরবনের ইমপ্যাক্ট জোনে বিষ প্রয়োগে মাছ ধরার মতো নতুন হুমকি দেখা দিয়েছে, যা মোকাবিলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং কমিউনিটি সম্পৃক্ততা বাড়ানো জরুরি।

কর্মশালায় সুন্দরবনের প্রাকৃতিক মূল্য এবং এর ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় বিদ্যমান জরুরি চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি প্রাণী সংরক্ষণ, প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার, জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা এবং সুন্দরবন ও এর ইমপ্যাক্ট জোনে কমিউনিটি সম্পৃক্ততা বিষয়ে প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অংশগ্রহণকারীরা সংরক্ষণ পরিকল্পনা, অবক্ষয়িত প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার করা এবং স্থানীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

CRIS প্রকল্পটি বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা এবং প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

17 − 9 =